
নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বামীর পরকিয়া সমস্যা জ্বীনের মাধ্যমে সমাধান করে দেওয়ার কথা বলে নারীদের থেকে টাকা হাতিয়ে নিত একটি চক্র। এছাড়াও, চক্রের সদস্যরা ভিডিওকলে সেবা দেওয়ার নামে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও চিনির রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নারীদের হাতে বার্ন সৃষ্টি করে আরও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতো। এমন এক প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
সোমবার (২৭ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর দক্ষিণ কল্যাণপুরে পিবিআই (উত্তর) এর কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহী।গ্রেফতারকৃত প্রতারক চক্রের সদস্যরা হলো- অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত ও মাহে আলম ও অহিদ মিয়ার ছোট ভাই মো. হাসান আলী।পিবিআই জানায়, গত ২৪ জুলাই মধ্যরাতে কুমিল্লার চান্দিনা থানাধীন হাড়িখোলা বিলের বাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রতারক চক্রের প্রধান অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত ও মাহে আলমকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন ভোর ৭টার পর নোয়াখালীর সুধারাম থানাধীন পূর্ব এজবালিয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে অহিদ মিয়ার ছোট ভাই মো. হাসান আলীকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একাধিক ফোন ও সিম উদ্ধার করা হয়েছে।
মো. ফজলে এলাহী বলেন, ‘মোসাম্মৎ সালমা আক্তার নামের এক নারী ফেসবুকে রহমত আলী কবিরাজ নামের একটি আইডির মাধ্যমে কথিত এক তান্ত্রিকের সঙ্গে পরিচিত হন। স্বামীর পরকীয়া সম্পর্ক দূর করার প্রলোভন দেখিয়ে ওই তান্ত্রিক প্রথমে হাদিয়া বাবদ তার কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা এবং পরে জালালী কবুতর কেনার অজুহাতে আরও সাড়ে ৩ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে নেয়। পরবর্তীতে জ্বীনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বলে ভুক্তভোগীকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি কিনতে এবং ইমু ভিডিওকলে তার নির্দেশনা অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে বলে। নির্দেশনা অনুসরণ করলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে ভুক্তভোগীর বাম হাতের তালুতে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়। পরে ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে আরও ১৬ হাজার টাকাসহ মোট ২১ হাজার টাকা প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে গত ২১ জুন খিলক্ষেত থানা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ আইনে মামলা করে।
পিবিআই মামলাটির তদন্তভার গ্রহণের পর তথ্য-প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করে। পরে কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে অভিযান চালিয়ে অহিদ মিয়া, মাহে আলম ও মো. হাসান আলীকে গ্রেফতার করে। তারা প্রতারণার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর অর্থ আত্মসাতের কথা স্বীকার করেছে এবং অহিদ মিয়া ও হাসান আলী ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।
ফজলে এলাহী আরও বলেন, গ্রেফতারকৃতরা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য জানিয়ে তিনি বলেন, চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে “তান্ত্রিক কবিরাজ”, “হোসেন কবিরাজ”, “আসমা কবিরাজ” এবং “রহমত আলী কবিরাজ” নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি ও ইমু অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তান্ত্রিক পরিচয়ে ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন নারীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করত। এরপর তারা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি একসঙ্গে হাতের তালুতে, নাভিতে নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে নির্দেশ দিতো। এর ফলে সংঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের হাতে ও নাভিতে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হতো। পরে ওই ক্ষত জ্বীনের মাধ্যমে সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস এবং জ্বীনের ভয় দেখিয়ে বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ আদায় করে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিত।
তিনি বলেন, চক্রটি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও একই ধরনের ভুয়া ফেসবুক পেজ পরিচালনা এবং ভারতীয় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করত। বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও তদবিরের নামে অর্থ গুগল পে (Google Pay)-এর মাধ্যমে গ্রহণ করে পরবর্তীতে হুন্ডির মাধ্যমে তারা সেই অর্থ বাংলাদেশে এনে আত্মসাৎ করত। তারা তাদের পরিচালিত ভুয়া ফেসবুক পেজগুলো অধিকসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন অ্যাড এজেন্সির মাধ্যমে নিয়মিত বুস্টিং করত, যাতে ভুয়া তান্ত্রিক সেবার প্রচারণা ছড়িয়ে দিয়ে নতুন নতুন ভুক্তভোগীকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে পারে।
এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রতারক চক্রটির অন্যান্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।