
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব তীব্রভাবে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। বাংলাদেশসহ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।
বাংলাদেশে সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর আগে বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়। দাম সমন্বয়ের পর সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও বাজারে স্থিতিশীলতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখনও ভোক্তাদের অতিরিক্ত দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর চিত্র
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ভারত নিজস্ব শোধনাগার সক্ষমতা থাকলেও মোট চাহিদার প্রায় ৮৮ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রভাবে দেশটি জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ ও নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে সরবরাহ চাপ বেড়েছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় অনেক পেট্রল পাম্পে জ্বালানি বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালী ঘিরে কোনো ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
অন্যদিকে পাকিস্তান বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে। দেশটিতে জ্বালানির দাম গত এক বছরে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক এলাকায় পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
শ্রীলঙ্কা আবারও জ্বালানি সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করা হয়েছে এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবুও রাজধানী কলম্বোসহ বিভিন্ন শহরে দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
নেপাল ভারতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরবরাহ সংকটে বেশি ভুগছে। দেশটিতে জ্বালানির দাম দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে সপ্তাহে দুই দিন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
দাম ও সরবরাহে চাপ
দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপণ্যের দামে প্রভাব ফেলছে। পাকিস্তানে পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি ৩১২ রুপি ছাড়িয়েছে, শ্রীলঙ্কায় ৪৫০ রুপির কাছাকাছি এবং নেপালে অকটেনের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ভারতে তুলনামূলকভাবে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয় করা হলেও অনেক রাজ্যে দাম ১০০ রুপির ওপরে।
বাংলাদেশে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ দিনের জ্বালানি মজুদ থাকলেও তা বাড়িয়ে ৪৫ দিনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি মজুদ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্বব্যাপী প্রভাব ও ঝুঁকি
বিশ্বব্যাংক–এর ‘সাউথ এশিয়া ইকোনমিক আপডেট (এপ্রিল ২০২৬)’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি আমদানিনির্ভর অঞ্চল। বৈশ্বিক সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
এছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য ও সরবরাহ সংকটের কারণে বাংলাদেশসহ পুরো অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতায় দ্রুত প্রভাবিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলা জরুরি।
তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়ে জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।