
পাঁচ বছরে ২৬০ সপ্তাহ, অসহায়দের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে ‘মেহমানখানা
সাব্বির আহমেদ | বালিয়াডাঙ্গী প্রতিনিধি
অসহায়, দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে গড়ে ওঠা ‘মেহমানখানা’ পেরিয়েছে পাঁচ বছর। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর এখানে জড়ো হন আশপাশের নিরন্ন ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ। তাদের সামনে পরিবেশন করা হয় গরম ভাত, ডাল, সবজি ও মাংসসহ নানা খাবার।
নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রতি শুক্রবার খাবার বিতরণের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যে ২৬০টি সপ্তাহ পার করেছে বালিয়াডাঙ্গী মেহমানখানা। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল।
জানা গেছে, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক ও শিক্ষক হারুন অর রশিদের উদ্যোগে পাঁচ বছর আগে এ মেহমানখানার যাত্রা শুরু হয়। পেশায় সাংবাদিক ও শিক্ষক হলেও অসহায় মানুষের প্রতি মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি এমন উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
করোনাকালীন কঠিন সময়ে আশপাশের মানুষের ক্ষুধা ও অসহায়ত্ব তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তখন তিনি উপলব্ধি করেন, সমাজের অনেক মানুষই একবেলা খাবারের নিশ্চয়তা ছাড়াই দিন কাটান। সেই উপলব্ধি থেকেই নিরন্ন মানুষের জন্য একটি মেহমানখানা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন হারুন অর রশিদ। পরে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।
প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর বাজার সংলগ্ন মেহমানখানায় একত্রিত হন হতদরিদ্র, প্রবীণ, বিধবা, অসহায়, দুস্থ, পথশিশু ও প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন শ্রেণির সুবিধাবঞ্চিত মানুষ। তাদের কাউকে অতিথি হিসেবে নয়, বরং আপনজনের মতো করেই আপ্যায়ন করা হয়। আগতদের মাঝে নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করেন হারুন অর রশিদ এবং পরম যত্নে তাদের খাওয়ান।
পাঁচ বছর ধরে এমন ধারাবাহিক মানবিক কার্যক্রমের ফলে প্রতি শুক্রবার মেহমানখানাটি হয়ে ওঠে অসহায় মানুষের এক মিলনস্থল। স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহযোগীদের সহায়তায় সময়ের সঙ্গে এ উদ্যোগও বিস্তৃত হয়েছে।
পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট মো. সৈয়দ আলম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. টি এম মাহাবুব রহমানসহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহযোগীরা।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সামর্থ্যবান প্রত্যেক মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। বালিয়াডাঙ্গী মেহমানখানার মতো উদ্যোগ শুধু ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে না, বরং সমাজে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার দৃষ্টান্তও তৈরি করছে।
আয়োজক হারুন অর রশিদ বলেন, পাঁচ বছর ধরে প্রতি শুক্রবার নিয়মিতভাবে অসহায় মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন করতে পেরে তিনি আনন্দিত। এই দীর্ঘ পথচলায় যারা অর্থ, শ্রম ও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
স্থানীয়দের মতে, ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষরা যদি এ ধরনের মানবিক কর্মকাণ্ডে এগিয়ে আসেন, তাহলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
মাত্র একজন মানুষের উদ্যোগ থেকে শুরু হওয়া বালিয়াডাঙ্গী মেহমানখানার এই পথচলা আজ পাঁচ বছরে ২৬০ সপ্তাহে পৌঁছেছে। প্রতি শুক্রবার একবেলা খাবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে এটি এখন শুধু একটি খাবার বিতরণের স্থান নয়—স্থানীয় মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছে মানবিকতা, ভালোবাসা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।