
হাবিবুর রহমান কলাম লিখেছেনঃ
বাংলাদেশ সরকারের প্রধানের প্রথম বিদেশ সফর শুরু থেকেই একটি হাই-ভোল্টেজ কূটনৈতিক সফর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও জাপানের প্রতিনিধিদের অস্বাভাবিক তৎপরতা এই সফরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—এই সফর কি বাংলাদেশের জন্য বড় কোনো অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক বা কৌশলগত অর্জয় বয়ে আনবে, নাকি এটি কেবল প্রোটোকল আর প্রতীকী সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
লাল গালিচায় ঝলমলে অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়া ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদ্যমান সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করে সম্পর্কের নতুন যুগে প্রবেশের আশাবাদ ব্যক্ত করেছে উভয় দেশ। কিন্তু কূটনৈতিক সৌজন্য আর বাস্তব অর্জন এক জিনিস নয়; রাষ্ট্রের জন্য শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে tangible gain—বাস্তব প্রাপ্তি।
মালয়েশিয়া সফরে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। কাগজে-কলমে এগুলো ইতিবাচক শোনালেও বড় প্রশ্ন থেকে যায়—বাংলাদেশের প্রত্যাশিত মূল অর্জন কোথায়? মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া ছিল সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অথচ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক বার্তা এলেও মালয়েশিয়ার আপত্তি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে সফরের বড় প্রত্যাশা অপূর্ণই রয়ে গেল।
চীন সফরে দৃশ্যত আরও বড় কূটনৈতিক আয়োজন দেখা গেছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণের প্রস্তাব আবারও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির সমঝোতাও রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
বেইজিং সফরের শেষ দিনে গ্রেট হলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে প্রায় ৫০ মিনিটের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে দুই নেতার একান্ত বৈঠক নিয়েও ব্যাপক প্রচার দেখা গেলেও, একটি আনুষ্ঠানিক ছবি ছাড়া নতুন কোনো বড় অর্থনৈতিক চুক্তি বা দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতির তথ্য সামনে আসেনি। প্রশ্ন তাই থেকেই যায়—বাংলাদেশ আসলে কী পেল?
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের ধারণা নতুন নয়; এটি চীনের বহুল আলোচিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ। এর লক্ষ্য ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত সংযোগ স্থাপন। কিন্তু এই করিডোরের ভেতরে একটি স্পর্শকাতর বাস্তবতা রয়েছে—রাখাইন ইস্যু। মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই করিডোরকে শুধু অর্থনৈতিক সুযোগ নয়, একইসঙ্গে একটি কৌশলগত ঝুঁকিতেও পরিণত করে।
এখানেই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে—কার লাভ বেশি হয়েছে? বাংলাদেশের প্রত্যাশিত বড় অর্থনৈতিক অর্জনের স্পষ্টতা না থাকলেও চীন তার কৌশলগত স্বার্থে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে বলেই মনে হয়। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আলোচনায় চীনের লাভ সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে ২০ থেকে ২৪টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার আলোচনা চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য বড় সাফল্য। অর্থাৎ যেখানে বাংলাদেশ দৃশ্যমান বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক সুবিধার প্রত্যাশা করছিল, সেখানে চীন তার অস্ত্র বাজার সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারে একধাপ এগিয়ে গেল।
কূটনৈতিক সফরের মূল্য কখনোই শুধু ছবি, করমর্দন বা লাল গালিচায় নির্ধারিত হয় না। এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, অর্থনৈতিক লাভ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুবিধার মাধ্যমে। মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সার্বিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ কিছু প্রতীকী ও প্রোটোকলভিত্তিক সাফল্য অর্জন করলেও কাঙ্ক্ষিত বড় অর্থনৈতিক অর্জন, শ্রমবাজারে অগ্রগতি কিংবা সুস্পষ্ট বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারেনি। বিপরীতে চীন তার দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য—অর্থনৈতিক করিডোর, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার—আরও সুসংহত করতে পেরেছে।
সুতরাং প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ডাবল সফর কি বাংলাদেশের জন্য বাস্তব অর্জনের দরজা খুলেছে, নাকি বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত খেলায় বাংলাদেশ আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে সফরটি ইতিহাসে সাফল্য হিসেবে লেখা হবে, নাকি হারানো সম্ভাবনার আরেকটি অধ্যায় হিসেবে।