
রাজবাড়ীতে তথ্য জালিয়াতি করে শিক্ষার্থী ভর্তি ও টিসি প্রদানের অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার
কৃষ্ণ কুমার সরকার
সরকারি বিধিমালা উপেক্ষা করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি, তথ্য জালিয়াতি এবং অভিভাবকের লিখিত আবেদন ছাড়াই বিদ্যালয়ের ছাড়পত্র (টিসি) প্রদানের অভিযোগ উঠেছে রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও পাংশা উপজেলার ইয়াকুব আলী চৌধুরী বিদ্যাপীঠের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী অভিভাবক মোফাজ্জেল হোসেন রাজবাড়ী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৃথক তিনটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। তদন্ত শেষে একটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। অপর একটি অভিযোগ নিষ্পন্ন হয়েছে এবং বাকি অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, মোফাজ্জেল হোসেনের মেয়ে আদৃতা রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির (প্রভাতী শাখা, রোল-৩৭) শিক্ষার্থী। পারিবারিক কারণে কিছুদিন পাংশায় অবস্থান করায় স্থানীয় ইয়াকুব আলী চৌধুরী বিদ্যাপীঠে সাময়িকভাবে ক্লাস করার সুযোগ চাওয়া হয়েছিল। তবে অভিভাবকের দাবি, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো বৈধ ছাড়পত্র (টিসি) ছাড়াই শিক্ষার্থীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভর্তি করে নেয়।
পরে বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে অভিযোগ করলে পাংশা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তদন্ত চলাকালে ইয়াকুব আলী চৌধুরী বিদ্যাপীঠের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ময়নুল হক লিখিতভাবে জানান, ওই নামে কোনো শিক্ষার্থী তাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি নেই।
তবে গত ১৩ মে প্রতিবেদকের সাথে মুঠোফোনে আলাপকালে একই প্রধান শিক্ষক জানান, শিক্ষার্থীটি তাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি রয়েছে এবং আগের প্রধান শিক্ষক তাকে ভর্তি করেছিলেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের আগের প্রধান শিক্ষক গত মার্চ মাসে অবসরে গেলেও অষ্টম শ্রেণির হাজিরা খাতায় মে মাসে শিক্ষার্থীটির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত উপস্থিতিও দেখানো হয়েছে। পরে হাজিরা খাতার ৬০ নম্বর ক্রমিক থেকে শিক্ষার্থীর নাম সাদা কালি (ফ্লুইড) দিয়ে মুছে সেখানে ইংরেজিতে “T.C” লেখা হয়। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এ ধরনের সংশোধনকে সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেছেন।
এদিকে অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তীতে অনিয়মকে বৈধতা দিতে গত ১৬ জুন রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শুধু শিক্ষার্থীর আবেদনের ভিত্তিতে টিসি ইস্যু করা হয়। অথচ প্রচলিত বিধি অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে অভিভাবকের আবেদন ছাড়া টিসি দেওয়ার সুযোগ নেই। পরে ওই টিসির ভিত্তিতে ইয়াকুব আলী চৌধুরী বিদ্যাপীঠে শিক্ষার্থীটিকে পুনরায় ভর্তি দেখানো হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক খালেদা পারভীন ও অফিস সহকারী হাসানের যোগসাজশে এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এখনও কোনো স্বাধীন তদন্তে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ হয়নি।
অভিযোগকারী মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, গত বছর অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে আমি সরাসরি পাংশায় যেতে পারিনি। রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সাথে দেখা করেও কোনো সহযোগিতা পাইনি।
আমাকে না জানিয়েই টিসি দেওয়া হয়েছে। পরে টিসির নথি দেখতে চাইলে অফিস সহকারী তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আমার লিখিত অভিযোগের তদন্ত হলেও অভিযোগকারী হিসেবে আমার কোনো বক্তব্য নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সদর আলী বলেন, বিষয়টির অফিশিয়াল জবাব সংশ্লিষ্ট দফতরে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ইয়াকুব আলী চৌধুরী বিদ্যাপীঠের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ময়নুল হক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পাংশা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ বি এম আব্দুল হান্নান বলেন, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, তদন্তে অভিযোগকারীর বক্তব্য নেওয়া হয়নি। ছাড়পত্র ছাড়া শিক্ষার্থীকে ক্লাস করানোর বিষয়ে তিনি বলেন, মানবিক কারণে হয়তো বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্লাস করার সুযোগ দিয়েছিল।
রাজবাড়ী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ বলেন, অভিভাবকের আবেদন ছাড়া কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর টিসি দেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় অনিয়ম করেছে। অভিভাবকের দেওয়া তিনটি অভিযোগের মধ্যে একটির সত্যতা পাওয়া গেছে, একটি নিষ্পন্ন হয়েছে এবং অপরটির তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি বিদ্যালয় হওয়ায় জেলা শিক্ষা অফিস থেকে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে মহাপরিচালক (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা) বরাবর অভিযোগ করা হলে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।