
মো শারীদ মোল্লা বিশেষ প্রতিনিধিঃ
দেশ থেকে রপ্তানি হওয়া মৎস্য সম্পদের মধ্যে চিংড়ির পর সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হচ্ছে কাঁকড়া। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছিল ৩০৯ কোটি টাকার। সদ্য বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরে কাঁকড়া রপ্তানি প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের উপকূলীয় অঞ্চল—বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল এলাকায় লবণাক্ত পানিতে কাঁকড়া চাষ অত্যন্ত সফলভাবে হচ্ছে। দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ কাঁকড়া রপ্তানি হয় চীন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে।
সফট সেল ও জীবন্ত—দুই ধরনের কাঁকড়া রপ্তানি
বাংলাদেশ থেকে মূলত দুটি ধরনের কাঁকড়া রপ্তানি হয়—
সফট সেল (নরম খোলসযুক্ত)
জীবন্ত কাঁকড়া
সফট সেল কাঁকড়া রপ্তানির সময় কাঁকড়াটি যখন পুরোনো শক্ত খোলস ঝরিয়ে নতুন খোলস গঠন করে, তখন সেটি সংগ্রহ করা হয়। নরম অবস্থায় থাকায় এটি পুরোপুরি খাওয়া যায় এবং এটি প্রসেস করে ফ্রোজেন অবস্থায় রপ্তানি করা হয়। জীবন্ত কাঁকড়া কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াই জীবিত অবস্থায় রপ্তানি করা হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন এককভাবে সর্বোচ্চ কাঁকড়া আমদানিকারক দেশ—রপ্তানি হয়েছে ৬৮৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকার কাঁকড়া। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে সফট সেল কাঁকড়ার চাহিদা বেশি।
উৎপাদনের হটস্পট খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশে কাঁকড়া চাষ হচ্ছে ১৬,৬৭২ হেক্টর জমিতে। এসব এলাকায় উৎপাদিত হয়েছে ১০,৭৮২ মেট্রিক টন কাঁকড়া।
সাতক্ষীরার বালিয়াপুর গ্রামের কাঁকড়া চাষি নিত্য সরকার জানান, তিনি প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ কেজি কাঁকড়া সংগ্রহ করেন এবং মাসে আয় করেন ২০-৩০ হাজার টাকা। যশোরের কেশবপুরের উদ্যোক্তা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, তার খামারে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮ টন সফট সেল কাঁকড়া উৎপাদিত হয়।
চ্যালেঞ্জ: কাঁকড়ার পোনা সংকট ও হ্যাচারির অকার্যকারিতা
এই খাতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা কাঁকড়ার পোনা (ক্র্যাব লেট) উৎপাদনে ঘাটতি। দেশে এখনো কৃত্রিম উপায়ে কাঁকড়ার ডিম থেকে পোনা উৎপাদনে সফলতা সীমিত। বর্তমানে প্রায় সব পোনা সংগ্রহ করা হয় সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকা থেকে, যেখানে বছরে পাঁচ মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে।
২০১৯ সালে কক্সবাজারে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি হ্যাচারি নির্মাণ করা হলেও, মাত্র ১৫ দিনের মাথায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) জানায়, দেশে কাঁকড়া চাষে বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। এখন পর্যন্ত ৫টি হ্যাচারিতে প্রায় ১৫ লাখ কাঁকড়ার পোনা উৎপাদন হলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল।
আন্তর্জাতিক বাজারে বিশাল চাহিদা
বিশ্ববাজারে কাঁকড়ার চাহিদা দিনে দিনে বাড়ছে। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪৫০ টন কাঁকড়া রপ্তানি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, চাষ কাঠামো উন্নয়ন, পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করা ও সরকারি সহায়তা বাড়ানো গেলে এই খাত হতে পারে দেশের অন্যতম রপ্তানি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
সফট সেল কাঁকড়ার বাজার মূল্য প্রতি কেজিতে ৮০০ থেকে ১,৪০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং তুলনামূলকভাবে দামি এই সামুদ্রিক পণ্য বিশ্বের অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।