
হাবিবুর রহমানঃ
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হবেন। এই বক্তব্যকে আমি কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে দেখি না; বরং এটি একজন দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী নেতার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বলেই মনে করি।
৮৬ বছর বয়সী একজন মহীয়সী রাজনৈতিক নেত্রী এমন সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই কেবল নিজের উজ্জ্বল রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নেবেন না। বরং নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, রাজনৈতিক অর্জন এবং নিজের একটি সুন্দর ঐতিহাসিক সমাধানের জন্য নেবেন।
আমি মনে করি, তিনি দেশে ফিরবেন! নিশ্চয়ই ফিরবেন! তাঁকে ফিরতেই হবে—কেন এমনটা মনে করি?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার পরিবারই একমাত্র পরিবার, যারা সপরিবারে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবেও তিনি বহুবার প্রাণঘাতী রাজনৈতিক হামলার শিকার হয়েছেন, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে মৃত্যুভয় তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রধান নির্ধারক নয়।
তবে তিনি একটি ভয় নিশ্চয়ই পান—নিজের মাতৃভূমির বাইরে মৃত্যু তথা পরবাসে মৃত্যু। এ যন্ত্রণাই তাঁকে দেশে ফিরতে সর্বোচ্চ সহায়তা করছে। একজন রাষ্ট্রনায়কের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কেবল তাঁর জীবনের কর্মে নয়, ইতিহাসে তাঁর শেষ অধ্যায় কীভাবে লেখা হলো, তার ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করে। যদি তিনি প্রবাসেই মৃত্যুবরণ করেন, তবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন ভিন্ন এক বাস্তবতায় আবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। সেই কারণেই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা তাঁর জন্য রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এরপর রাষ্ট্র তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করবে, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে নিশ্চয়ই বুঝিয়েছে যে, রাজনৈতিক সংকট কত দ্রুত জীবন-মৃত্যুর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও বাস্তববাদী করে তুলেছে বলেই ধারণা করা যায়।
তিনি যদি দেশে ফেরেন, তাহলে বিচার, দণ্ড কিংবা কঠোর আইনি পরিণতি, এমনকি তিনি জুডিশিয়াল হত্যাকাণ্ডের শিকারও হতে পারেন। তবুও তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সঠিক একটি পদক্ষেপ।
এমন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাঁর সামনে তিনটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক অর্জন থাকতে পারে—
প্রথমত, তিনি তাঁর সমর্থকদের কাছে দেশবিরোধী বলে বিবেচিত শক্তির বিরুদ্ধে আবারও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার বার্তা দিতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, তাঁর প্রত্যাবর্তন আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে এমন পুনর্জাগরণ ঘটাবে যে আগামী ২৫ বছরের রাষ্ট্রক্ষমতার পুনরাবৃত্তির সুযোগ তৈরি হবে।
তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনটি হবে—নিজের জীবনের শেষ অধ্যায় এবং চিরনিদ্রার স্থান নিজের দেশেই নিশ্চিত করার সুযোগ।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কী লিখবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে শেখ হাসিনার এই ঘোষণা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।