
তিন দশক ধরে কাঁধে মিষ্টির হাঁড়ি, তিন জেলার গ্রামে গ্রামে সমীরের মিষ্টিমাখা পথচলা
মোস্তাফিজুর রহমান লিটন
রাজশাহী ব্যুরো
ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় দিনের ব্যস্ততা। চুলার আগুনে ধীরে ধীরে জ্বাল হতে থাকে টাটকা দুধ। সেই দুধ থেকেই তৈরি হয় ক্ষীরশা, প্যাড়া সন্দেশ আর সুমিষ্ট রসমালাই। সব প্রস্তুতি শেষ হলে কাঁধে মিষ্টিভর্তি পাত্র তুলে নেন সমীর চন্দ্র ঘোষ। এরপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ পথচলা—প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার হেঁটে জয়পুরহাট, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেন নিজের হাতে তৈরি মিষ্টি।
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌর শহরের হাস্তাবসন্তপুর ঘোষপাড়া মহল্লার বাসিন্দা সমীর চন্দ্র ঘোষের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে এই পেশা। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি একইভাবে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মিষ্টি বিক্রি করছেন। এটি তাঁর পূর্বপুরুষদের পেশা। বাবা ও দাদাও কাঁধে মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতেন। তবে নিষ্ঠা, সততা ও মিষ্টির স্বাদের গুণে সমীর নিজস্ব একটি পরিচিতি ও আস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রতিদিন ভোরে মিষ্টি তৈরির কাজ শেষ করে তিনি বেরিয়ে পড়েন নির্ধারিত পথে। জয়পুরহাট ছাড়াও বগুড়া ও নওগাঁ জেলার বিভিন্ন গ্রামের নিয়মিত ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেন তাঁর তৈরি মিষ্টি। দিন শেষে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মিষ্টি বিক্রি হয়। এই আয়ের ওপরই নির্ভর করে তাঁর পুরো সংসার।
সমীর চন্দ্র ঘোষ বলেন, “প্রায় ৩০ বছর ধরে এই কাজ করছি। এটা আমাদের বাপ-দাদার পেশা। অনেকেই অন্য কাজ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু এই পেশার প্রতি আমার আলাদা টান রয়েছে। সবচেয়ে বড় তৃপ্তি হলো, মানুষ আমার হাতে তৈরি মিষ্টির জন্য অপেক্ষা করেন। এখন বড় বড় মিষ্টির দোকান হয়েছে, তারপরও গ্রামের মানুষ আমার ওপর যে বিশ্বাস রাখেন, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
আক্কেলপুর উপজেলার শালুককুড়ি গ্রামের বাসিন্দা মো. তমিজউদ্দিন বলেন, “ছোটবেলা থেকেই সমীর বাবুর রসমালাই খেয়ে আসছি। আজও সেই আগের স্বাদ অটুট আছে। তিনি গ্রামে আসবেন শুনলেই অনেকেই অপেক্ষা করেন।”
নওগাঁর সদর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা সফুর চৌধুরী বলেন, “বাজারের অনেক মিষ্টি খেয়েছি, কিন্তু সমীর দাদার রসমালাইয়ের মতো স্বাদ পাই না। তিনি এলে পরিবারের সবার জন্য মিষ্টি কিনি, আত্মীয়দের বাড়িতেও নিয়ে যাই।” একই ইউনিয়নের বাসিন্দা ডাক্তার জাকির সমীর সম্পর্কে ঠিক একই কথা বলেন ।
বগুড়ার আদমদিঘি উপজেলার বাসিন্দা আব্দুর রহমান এর মা শিল্পী বলেন, “সমীর চন্দ্র বহু বছর ধরে আমাদের এলাকায় আসছেন। তাঁর মিষ্টির মান ভালো, দামও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। তাই তিনি এলে মিষ্টি কিনতে মানুষের ভিড় লেগে যায়।”
পরিবর্তিত সময়ে আধুনিক মিষ্টির দোকান ও নতুন ব্যবসার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা। তবে সেই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কাঁধে মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে এখনো গ্রাম থেকে গ্রামে হাঁটছেন সমীর চন্দ্র ঘোষ। তাঁর এই পথচলা শুধু জীবিকা নয়, বরং একটি পারিবারিক ঐতিহ্য, মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং গ্রামীণ বাংলার এক অনন্য সংস্কৃতিরও জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
ছবি সংগৃহীত।