
হাবিবুর রহমানঃ
রাষ্ট্র থেকে সমাজ ব্যবস্থা, সমাজ থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সম্পর্ক—আর সম্পর্কগুলোর ভেতর থেকে ধীরে ধীরে মহব্বত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষয় একদিনে তৈরি হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ফল। আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষের বাহ্যিক উন্নতি যত বেড়েছে, অন্তর্গত মানবিকতা যেন তত সংকুচিত হয়েছে
আজকের সমাজে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধের পেছনে শুধু ব্যক্তি-স্বার্থ বা অর্থনৈতিক কারণ নেই; গভীরে গেলে দেখা যায় সম্পর্কের ভাঙন, মূল্যবোধের পতন এবং মানবিকতার সংকট বড় ভূমিকা রাখছে। খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, নির্যাতন—এসব অপরাধের সঙ্গে ক্রমশ পারিবারিক বা পরিচিত মানুষের সংশ্লিষ্টতা বাড়ছে। অপরাধী এখন আর দূরের কেউ নয়; অনেক ক্ষেত্রে সে পরিবারের ভেতরের মানুষ, আত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা ঘনিষ্ঠ পরিচিত।
সবচেয়ে ভয়াবহ বাস্তবতা হলো—যে পরিবার একসময় নিরাপত্তার আশ্রয় ছিল, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে অনিরাপত্তার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। বাবা-মা দ্বারা সন্তান হত্যা, সন্তান দ্বারা বাবা-মাকে নির্যাতন বা হত্যা, ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহিংসতা—এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি গভীর সামাজিক রোগের লক্ষণ।
একটি রাষ্ট্রের চরিত্র সমাজকে প্রভাবিত করে। যখন রাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের সংকট দেখা দেয়, দুর্নীতি স্বাভাবিক হয়ে যায়, ক্ষমতা জবাবদিহিহীন হয়ে পড়ে—তখন সমাজে নৈতিকতার ভিত্তিও দুর্বল হতে শুরু করে। মানুষ যখন দেখে অন্যায় করেও পার পাওয়া যায়, তখন অন্যায়ের প্রতি ভয় কমে যায়। আইনের শাসন দুর্বল হলে নৈতিক শাসনও দুর্বল হয়। কারণ রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি একটি নৈতিক বার্তাও দেয়—কী গ্রহণযোগ্য, কী অগ্রহণযোগ্য।
এভাবেই অবক্ষয় রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সমাজের দিকে ধাবিত হয়। তারপর পরিবারে গিয়ে মিশে যায়।
পরিবার মানুষের প্রথম শিক্ষালয়। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, অর্থনৈতিক চাপ, ডিজিটাল আসক্তি এবং পারস্পরিক দূরত্ব পরিবারকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। এক ছাদের নিচে থেকেও মানুষ মানসিকভাবে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। কথোপকথন কমছে, বোঝাপড়া কমছে, ধৈর্য কমছে। ভালোবাসার জায়গায় জায়গা নিচ্ছে বিরক্তি, সহমর্মিতার জায়গায় স্বার্থ, আর ত্যাগের জায়গায় হিসাব। এভাবেই এক একটি সম্পর্ক এক একটি লেনদেনে পরিণত হয় এবং মহব্বতগুলো ছিটকে পড়ে অজানা কোনো কোনায়।
নৈতিক শিক্ষার পতন: আজকের প্রজন্ম তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু মূল্যবোধে দুর্বল—এ কথা পুরোপুরি সঠিক না হলেও অনেক ক্ষেত্রে সত্য। শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষতা শেখাচ্ছে, কিন্তু চরিত্র গঠন কতটা করছে—সেটা বড় প্রশ্ন।
নৈতিক শিক্ষা, আদব, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ—এসব চর্চা পরিবার ও সমাজ দুই জায়গাতেই কমে যাচ্ছে। ফলে মানুষ সফল হতে শিখছে, কিন্তু ভালো মানুষ হতে শিখছে না।
একজন প্রযুক্তিতে দক্ষ মানুষও নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ছে—এটাই বর্তমান সমাজের অন্যতম ট্র্যাজেডি।
আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অপরাধের প্রতি মানুষের সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া। প্রতিদিন এত খুন, ধর্ষণ, নির্যাতনের খবর আসে যে অনেকেই যেন এতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। যখন সমাজ অপরাধে বিস্মিত হওয়া বন্ধ করে, তখন অপরাধ আরও সহজ হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও কখনো কখনো সহিংসতা, ঘৃণা এবং অপমানকে স্বাভাবিক করে তুলছে। ভাষার সহিংসতা অনেক সময় বাস্তব সহিংসতার পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়ায়।
সম্পর্কের গভীরতা তথা মহব্বত হঠাৎ হারিয়ে যায় না; ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। যখন মানুষ মানুষকে ব্যবহার করতে শেখে, যখন সম্পর্ক বিশ্বাস হারায়, যখন স্বার্থ ভালোবাসাকে ছাপিয়ে যায়, যখন ক্ষমা ও সহনশীলতা কমে যায়, যখন ধর্ম, নৈতিকতা ও আত্মজিজ্ঞাসা দুর্বল হয়—তখন ভালোবাসা শুকিয়ে যায়, আবেগ ফুরিয়ে যায়। মহব্বত মানে শুধু আবেগ নয়; মহব্বত মানে দায়িত্ব, ত্যাগ, ধৈর্য এবং অপরের প্রতি আন্তরিক দায়বদ্ধতা।
এই অবক্ষয় থেকে বের হতে হলে কেবল আইন কঠোর করলেই হবে না। প্রয়োজন বহুমাত্রিক পরিবর্তন।
প্রথমত: রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।দ্বিতীয়ত: পরিবারে সময়, সংলাপ ও আবেগীয় সংযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে।তৃতীয়ত: শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা শক্তিশালী করতে হবে।চতুর্থত: ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্যবোধ পুনর্গঠনে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।পঞ্চমত: ব্যক্তি পর্যায়ে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির চর্চা বাড়াতে হবে।
আজ যে অপরাধগুলো আমরা দেখছি, সেগুলো কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতার গল্প নয়; এগুলো আমাদের সম্মিলিত নৈতিক পতনের প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্র যদি ন্যায় হারায়, সমাজ যদি মূল্যবোধ হারায়, পরিবার যদি ভালোবাসা হারায়—তবে সম্পর্কও টিকবে না। আর সম্পর্ক থেকে মহব্বত চলে গেলে মানুষ বাহ্যিকভাবে মানুষ থাকলেও ভেতরে ভেতরে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। সভ্যতার প্রকৃত সংকট অর্থনৈতিক নয়; মানবিক।
তাই প্রশ্ন একটাই—আমরা কি এখনো সময় থাকতে মহব্বত, নৈতিকতা ও মানবিকতাকে ফিরিয়ে আনতে পারব, নাকি আরও ভয়ংকর এক নিষ্ঠুর সমাজের দিকে এগিয়ে যাব?