
মোঃ হাবিবুর রহমান রাজনৈতিক বিশ্লেষকঃ
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন ক্রমেই বেশি উচ্চারিত হচ্ছে—শেখ হাসিনা কবে ফিরবেন?
এক অর্থে দেশের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝেই এই প্রশ্নের প্রতিধ্বনি রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তার প্রত্যাবর্তনকে বিচার ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতার প্রসঙ্গে দেখছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ ও তার সমর্থকেরা অপেক্ষা করছেন তাদের নেত্রীকে আবার দেশের মাটিতে দেখার জন্য। আর শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময় দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
সব মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এখনো কেন্দ্রীয় ও প্রভাবশালী চরিত্র। তিনি অনুপস্থিত, কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক নন; বরং তার অনুপস্থিতিই তাকে আরও বেশি আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—তিনি ফিরছেন না কেন? অথবা কবে ফিরবেন?
রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি সময়, কৌশল, জনমত, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দৃঢ়তা, কৌশলগত চিন্তাশক্তি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে তার উপলব্ধি বলছে—তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সঠিক সময়ের অপেক্ষায় আছেন।
২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথমদিকে একটি বড় অংশ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের একাংশ বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে। অনেকেই তুলনা করছেন—অতীতে কী ছিল এবং বর্তমানে কী ঘটছে।
রাজনীতিতে আবেগ ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। মানুষ শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। সম্ভবত শেখ হাসিনাও সেই বাস্তবতাকেই গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছেন।
তার অনুপস্থিতি হয়তো একটি রাজনৈতিক পরীক্ষার সময়ও তৈরি করেছে, যেখানে জনগণ বিকল্প শক্তিগুলোর সক্ষমতা, নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা যাচাই করার সুযোগ পাচ্ছে। কারণ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অনেক সময় একজন নেতার গুরুত্ব শুধু তার উপস্থিতিতে নয়, তার অনুপস্থিতির প্রভাবেও পরিমাপ করা হয়।
বর্তমান বাস্তবতায় আরেকটি বিষয় স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান—বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রায় সব পক্ষই এখনো শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করছে। কেউ তাকে রাজনৈতিক সংকটের কারণ হিসেবে তুলে ধরছে, কেউ রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখছে, আবার কেউ তাকে রাজনৈতিক প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দু মনে করছে। অর্থাৎ তিনি অনুপস্থিত থেকেও রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
ইতিহাসও বলে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি এত সহজে ঘটে না। বরং সংকট, বিরোধিতা ও অনুপস্থিতি অনেক সময় একজন নেতাকে আরও বড় রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত করে।
আজকের বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ মূলত তিনটি বিষয়ের উত্তর খুঁজছে—
১. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
২. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
৩. প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা
যে রাজনৈতিক শক্তি জনগণকে এই তিন বিষয়ে বেশি আস্থা দিতে পারবে, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তার দিকেই ঝুঁকবে।
সেই কারণেই শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি শুধু একজন ব্যক্তির প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা এবং জনগণের মানসিক অবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সম্ভবত তিনি সময় নিচ্ছেন—নিজের প্রত্যাবর্তনের পথকে আরও সুসংগঠিত ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে। রাজনৈতিক সমর্থন, জনমত ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হওয়ার অপেক্ষাই হয়তো তিনি করছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় রাজনৈতিক শূন্যতা দীর্ঘদিন শূন্য থাকে না। যে নেতা রাষ্ট্রীয় স্মৃতি, রাজনৈতিক ইতিহাস ও জনগণের আবেগের বড় অংশ জুড়ে থাকেন, তাকে সরিয়ে দিলেই তার প্রভাব শেষ হয়ে যায় না। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেটিই দেখা যাচ্ছে।
তার সমর্থকেরা তাকে অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে বিরোধীরাও প্রতিনিয়ত তাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখছে। কারণ তারা জানে—তিনি এখনো প্রাসঙ্গিক।
রাজনীতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী উপস্থিতি কখনো কখনো সেই নেতারই হয়, যার অনুপস্থিতিও রাজনীতিকে প্রভাবিত করে।
একই সঙ্গে এটিও লক্ষণীয় যে, বর্তমান অনেক রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের ইতিবাচক কর্মপরিকল্পনার চেয়ে “শেখ হাসিনা বিরোধিতা” দিয়েই বেশি পরিচিত হতে চাইছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধু বিরোধিতার রাজনীতি টিকে থাকে না। জনগণ শেষ পর্যন্ত জানতে চায়—
অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কী?
রাষ্ট্র কতটা স্থিতিশীল থাকবে?
কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা কে নিশ্চিত করবে?
বিকল্প নেতৃত্বের বাস্তব পরিকল্পনা কী?
যখন এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর মানুষ পায় না, তখন তারা অতীতকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শুরু করে। সম্ভবত এ কারণেই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ধীরে ধীরে নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে।
ইতিহাস বলে—বাংলাদেশে কোনো বড় রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি কেবল ঘোষণায় হয় না; জনগণের মন, রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা ও সময়—এই তিনটির সমন্বয়েই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
তাই প্রশ্ন এখন শুধু “শেখ হাসিনা ফিরবেন কি না”—সেটি নয়।
প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে আবার কবে প্রয়োজন মনে করবে?