
মো: হাবিবুর রহমান রাজনৈতিক বিশ্লেষকঃ
সরকার কর্তৃক পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রথম ধাপের অনুমোদন দেওয়ার পর দেশের অনেক মানুষের মতো আমিও আশাবাদী ও উচ্ছ্বসিত হয়েছি। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট, কৃষি উৎপাদন ও নদীভাঙন সমস্যার প্রেক্ষাপটে এ প্রকল্প নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সেই আগ্রহ থেকেই প্রকল্পটির সম্ভাবনা, ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা নিয়ে কিছু বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
বাংলাদেশে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক feasibility study শুরু হয় ২০০৪ সালে। তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময় এই সমীক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে ২০১৩ সালে এর মূল প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৫–২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞদের যৌথ অংশগ্রহণে প্রকল্পটির engineering review, field verification ও feasibility validation কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB) প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রথম ধাপ অনুমোদন পেয়েছে এবং ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন হলো—২০১৬ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পটি অগ্রসর হয়নি কেন?
পূর্ববর্তী বিভিন্ন সমীক্ষা, বিশেষজ্ঞ মতামত ও বিশ্লেষণে কয়েকটি বড় কারণ সামনে আসে।
প্রথমত, এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি মেগা প্রকল্প। শুধুমাত্র ব্যারেজ নির্মাণ নয়; নদীশাসন, ড্রেজিং, সেচ খাল, তীররক্ষা ও পুনর্বাসন—সব মিলিয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বিপুল। সেই সময় সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও সক্ষমতার বিবেচনায় প্রকল্পটি ধীরগতিতে এগিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পদ্মা নদীর প্রকৃতি নিজেই একটি বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। পদ্মা অত্যন্ত প্রশস্ত, গভীর, প্রবল স্রোতসম্পন্ন এবং উচ্চ পলিবাহী নদী। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তলদেশের অস্থিতিশীলতা ও sediment load—এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, ব্যারেজ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও গতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে।
তৃতীয়ত, আন্তঃসীমান্ত পানি রাজনীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পদ্মা মূলত গঙ্গার নিম্নধারা হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে upstream থেকে পর্যাপ্ত পানি না এলে ব্যারেজের কার্যকারিতা প্রত্যাশিত মাত্রায় নাও থাকতে পারে। ফলে এটি কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; বরং আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
চতুর্থত, ওই সময় সরকার পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ খাত, এলএনজি ও কর্ণফুলী টানেলের মতো অন্যান্য বড় প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাখা হয়।
এছাড়া পরিবেশগত উদ্বেগও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, sediment flow ব্যাহত হলে downstream ecosystem, মৎস্যসম্পদ, চরাঞ্চল ও নৌপথের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে সম্ভাব্য সুবিধার দিক থেকেও প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। feasibility study অনুযায়ী, প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা দেখা হচ্ছে সেচ ব্যবস্থায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট কমে যেতে পারে। কৃষিতে বহুমুখীকরণ বৃদ্ধি, একাধিক ফসল উৎপাদন এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। সম্ভাব্য উপকারভোগী অঞ্চল হিসেবে রাজশাহী, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা ও গোপালগঞ্জকে বিবেচনা করা হয়েছে।
এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, নৌপথের নাব্যতা রক্ষা, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সীমিত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। ব্যারেজের উপরিভাগে সেতু সংযোগ স্থাপন করা গেলে রাজবাড়ী–পাবনা অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত হতে পারে।
অন্যদিকে ঝুঁকিগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পদ্মা বিশ্বের অন্যতম পলিবাহী নদী হওয়ায় upstream এলাকায় অতিরিক্ত sediment জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে নাব্যতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পানি ব্যবস্থাপনায় ভুল হলে বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। অতিবৃষ্টি বা অতিরিক্ত প্রবাহের সময় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে upstream অঞ্চলে পানি জমে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এছাড়া নদীর গতিপথ পরিবর্তন, নতুন ভাঙন, চর সৃষ্টির ধরণ বদলে যাওয়া এবং downstream এলাকায় পানিপ্রবাহের আচরণ পরিবর্তনের মতো জটিল পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে।
মৎস্যসম্পদ ও পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক মাছের প্রজনন ও migration স্বাভাবিক নদীপ্রবাহের উপর নির্ভরশীল। ব্যারেজের কারণে জীববৈচিত্র্য ও জলাভূমির ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো maintenance cost। শুধুমাত্র নির্মাণ নয়; নিয়মিত ড্রেজিং, নদীশাসন, গেট রক্ষণাবেক্ষণ ও তীর সংরক্ষণের জন্য প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের তুলনায় প্রকল্পের আর্থিক return কতটা কার্যকর হবে—সেটি গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে satellite image analysis, discharge data analysis ও field inspection করা হয়েছে। তবে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ feasibility study সম্পন্ন হয়েছে কি না—সেই বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
সুতরাং প্রশ্ন উঠতেই পারে—২০১৩–২০১৬ সালের feasibility ও engineering verification-এর ভিত্তিতেই কি প্রকল্প বাস্তবায়ন এগোচ্ছে, নাকি বর্তমান বাস্তবতায় নতুন পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে?
কারণ পদ্মার মতো অত্যন্ত গতিশীল ও জটিল নদীর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি environmental impact, sediment management, downstream ecosystem এবং maintenance sustainability—এসব বিষয়ে আরও বিস্তৃত ও স্বচ্ছ জনপর্যালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি নিরাপত্তা, কৃষি ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। তবে একইসঙ্গে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল নদীভিত্তিক অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর একটি হতে যাচ্ছে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক সতর্কতা, আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।