
স্টাফ রিপোর্টার: রিমন হোসেন
ভিডিও স্ট্রিমিং অ্যাপ ‘কিউ লাইভ’ ও ‘লাইকি’-এর মাধ্যমে অশ্লীলতা ছড়িয়ে এবং ভার্চুয়াল মুদ্রা ‘কয়েন’ বিক্রির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। তদন্তে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ থেকে অন্তত ১০৮ কোটি টাকা আয় করে তার মধ্যে প্রায় ৮৮ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
অর্থপাচার ও সাইবার অপরাধের এই ঘটনায় সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) সোহেল রানা বাদী হয়ে গত ২৯ অক্টোবর একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন—কিউ বাংলা লিমিটেড, এর বাংলাদেশি কর্মী এস. এম. হিটলার (আরিয়ান), ইরশাদ (সুপার এডমিন), কৃষক, পুতুল, এবং মনসন হোল্ডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
অশ্লীলতার আড়ালে ভার্চুয়াল কয়েন ব্যবসা
সিআইডির সাইবার ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, বিদেশি নাগরিকদের মালিকানাধীন ‘কিউ লাইভ’ ও ‘লাইকি’ অ্যাপ দুটির সঙ্গে সরাসরি জড়িত বাংলাদেশের কয়েকজন প্রশাসক নিয়মিত তরুণ-তরুণীদের মাসিক বেতনে নিয়োগ দিতেন। এসব তরুণীরা অ্যাপে “লাইভ ব্রডকাস্টার” হিসেবে কাজ করতেন।
তাদের মূল কাজ ছিল ভিডিও লাইভে অংশ নিয়ে কথিত বিনোদনের নামে অশ্লীল কনটেন্ট প্রচার করা, আর দর্শকদের কাছ থেকে ডিজিটাল কয়েন উপহার নেওয়া। পরে এসব কয়েন টাকা হিসেবে রূপান্তরিত হতো।
প্রতিটি অ্যাপে দুটি ধরণের আইডি থাকে—
ব্রডকাস্টার আইডি (লাইভার): যারা লাইভ স্ট্রিম করে।
সাপোর্টার বা সেন্ডার আইডি: যারা কয়েন পাঠায় বা উপহার দেয়।
যে ব্রডকাস্টার যত বেশি কয়েন উপহার পেতেন, তিনি তত বেশি সময় ও অশ্লীল কনটেন্ট প্রদর্শন করতেন। এতে দেশের উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীরা অনৈতিকতার জালে জড়িয়ে পড়ছিলেন বলে সিআইডি জানিয়েছে।
কয়েন বেচাকেনায় ব্যাংক ও এজেন্সির ভূমিকা
সিআইডির ডিআইজি জামিল আহমেদ জানান, সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে কয়েন বিক্রির জন্য বাংলাদেশে একাধিক এজেন্সি গড়ে উঠেছে। এসব এজেন্সি বিভিন্ন নামে ফেসবুক ও অনলাইন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিতো।
ব্যবহারকারীরা মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং বা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে কয়েন কিনতেন। পরে সেই টাকা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হতো এবং সেখান থেকে বিদেশে পাচার করা হতো।
তদন্তে যেসব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য উঠে এসেছে—
Dutch Bangla Bank
Account Name: Zain Accessories & Suppliers
Account No: 1731100019305
Branch: Bhairab Branch
Routing No: 090480193
Peoples Trading Agency (Islami Bank PLC)
Account No: 20502130100294917
Branch: Head Office Complex Corporate Branch
Routing No: 125272689
SWIFT Code: IBBLBDDH213
প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা পাচার
সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বাংলাদেশে অন্তত লক্ষাধিক কিউ লাইভ ব্যবহারকারী ও প্রবাসী বাংলাদেশি এই কয়েন ব্যবস্থায় যুক্ত। এজেন্সিগুলো বিদেশি অ্যাডমিনদের কাছ থেকে কয়েন কিনে এনে দেশীয় ব্যবহারকারীদের কাছে বিক্রি করত।
এই প্রক্রিয়ায় প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে সাইবার ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান। বর্তমানে পুরো চক্রটির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
সিআইডির বক্তব্য
অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, “কিউ লাইভ ও লাইকির মতো অ্যাপগুলো দেশের যুবসমাজ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে তৈরি। এরা বিনোদনের ছলে মানুষকে ভার্চুয়াল মুদ্রার ফাঁদে ফেলে দিচ্ছে। আমরা এর সঙ্গে জড়িতদের সনাক্ত করেছি এবং প্রমাণসহ মামলা দায়ের করেছি।”
তিনি আরও জানান, বিদেশি নাগরিকদের সম্পৃক্ততা সম্পর্কেও অনুসন্ধান চলছে। নাম ও অবস্থান নিশ্চিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও ইন্টারপোল সহযোগিতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।