
মো. জোনায়েদ হোসেন জুয়েল জেলা প্রতিনিধিঃ
কিশোরগঞ্জ শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা ঐতিহ্যবাহী নরসুন্দা নদী আজ মৃত্যুপথযাত্রী। কাগজে-কলমে উন্নয়ন—বাস্তবে তা যেন নদী হত্যার নীলনকশা। শহরের রঘুখালী এলাকায় যে “সেতু” নির্মাণের কাজ চলছে, তা কার্যত নদীর বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে একটি স্থায়ী বাঁধের মতো। ফলে বিপর্যস্ত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, বাড়ছে জলাবদ্ধতা, জমছে পচা পানি, আর মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে পরিবেশ ও আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রা।
সেতুর নামে স্থায়ী বাধা?
২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হয় কিশোরগঞ্জ বাইপাস সড়কের রঘুখালী অংশে ৪০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতুর নির্মাণকাজ। প্রায় ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকার এই প্রকল্পের কাজ এখনও ৪০ শতাংশের বেশি অগ্রসর হয়নি। তবে স্থানীয়রা বলছেন, এটি আদতে সেতু নয়—নদীর মাঝে বালু, মাটি ও পাথর ফেলে পানি আটকে ফেলা হয়েছে। ফলে পানির স্বাভাবিক গতি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর দুই পাশে জমেছে দুর্গন্ধযুক্ত পচা পানি, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি।
জীবন-জীবিকা পড়েছে সংকটে৷
নৌচালক, জেলে ও কৃষকেরা বলছেন, নদীর এই অবস্থা চলতে থাকলে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। কৃষিজমিতে পানি জমে থাকবে, যা সরাসরি খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে। বর্ষা এলে বন্যার ঝুঁকি দ্বিগুণ হবে। নরসুন্দার এই বিপর্যয় স্থানীয় অর্থনীতি, কৃষি ও জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
পরিবেশবাদীদের কড়া সমালোচনা৷
নদী ও পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন এই প্রকল্পকে আখ্যা দিয়েছেন “পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন” হিসেবে।
‘রিভার বাংলা’র সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ বলেন:
> “এই যে কাঠামো, তা নদীর স্বাভাবিক গতিপথ আটকে দিচ্ছে। বর্ষায় এটি বাঁধ হিসেবে কাজ করবে, যার ফলাফল হবে মারাত্মক।
বাপা (বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন) কিশোরগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন:
> “একদিকে সরকার ১৩০০ কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে, অন্যদিকে এলজিইডি এমন কাজ করে নদী ধ্বংস করছে। এটা আত্মঘাতী উদ্যোগ। স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা প্রতিরোধ গড়ব।”
প্রশাসনের দায়সারা জবাব৷
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ এনায়েত কবীর জানান:
> “প্রকল্পটি অনুমোদিত ডিজাইন অনুযায়ী চলছে। আমি তখন দায়িত্বে ছিলাম না, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”
কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন—যদি ডিজাইনেই নদীপ্রবাহের কথা না-thake, তাহলে সেই অনুমোদন দিল কে? দায় নেবে কে?
উন্নয়ন না কি প্রাকৃতিক হত্যাকাণ্ড?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীপ্রবাহ বন্ধ করে সেতু নির্মাণ কখনোই টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। উন্নয়ন মানে শুধু কাঠামো নয়—তা হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও জনগণের স্বার্থে।
জনগণের একটাই দাবি—নদীকে বাঁচতে দাও
নরসুন্দা নদী যেন আবার ফিরে পায় তার প্রাণ, তার স্বাভাবিক গতি। তাই স্থানীয়রা চাইছেন—পুনরায় পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে, নদীর গতিপথ রক্ষা করে সেতু নির্মাণ হোক। পানি চলাচল, নৌযান চলাচল, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য যেন টিকে থাকে—এমন পরিকল্পনাই এখন সময়ের দাবি।