
ইমদাদুল হক রানা, রাজবাড়ী থেকে:
“মানুষ বাঁচে স্বপ্নে, কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়।বারুগ্রামবাসী এখন শুধু আশায় বেঁচে আছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো কি সময়ের দাবি নয়?”
রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বারুগ্রাম আশ্রয়ন প্রকল্প যেন আজ এক নিঃশব্দ চিৎকার। সময়ের ভারে নুয়ে পড়া ১৮০টি ঘর এখন কেবল ইট-পাথরের জঞ্জাল নয়—এ যেন স্বপ্নভঙ্গের এক মর্মান্তিক নিদর্শন।
২০০১ সালে যখন তৎকালীন সংসদ সদস্য নাসিরুল হক সাবু প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন, তখন শতাধিক ভূমিহীন পরিবার বুকভরা আশা নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল এই নতুন ঠিকানায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বপ্ন এখন কেবল টিন-ভাঙা চাল, ফাটল ধরা দেয়াল আর পানিতে ভিজে যাওয়া মেঝের মাঝে আটকে গেছে।
ভাঙা ঘরের এক কোণে বসে থাকা আবুল কাশেম মোল্লা, যিনি প্রকল্পের সভাপতি, হতাশার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন— তৎকালীন সময়ে আমাদেরকে আশ্রয়নের পাশাপাশি কর্মের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিলো। নতুন করে বাচাঁর স্বপ্ন, আশার আলো আমাদের লোকালয় থেকে ৩ কিলোমিটার দুরে বসত করার সাহস যুগিয়ে ছিলো। “আশ্রয় তো পেলাম, কিন্তু পেটের ভাত পেলাম না। কাজ নেই, উপার্জন নেই—এই ঘর আমাদের মাথার ছাদ, আবার বেকারত্বের অভিশাপ আমাদের নিত্যদিনের কান্না।”
অপরদিকে সাধারণ সম্পাদক সুজন শেখ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন— “এখানে আমাদের শিশুরা কেবল ক্ষুধা,দারিদ্র্ শেখে, শিক্ষা নয়। লেখাপড়া যেন এদের জন্য এক অলীক কল্পনা।” লোকালয় থেকে ৩ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত বারুগ্রাম আবাসন প্রকল্প। এখানে নেই কোন শিক্ষার ব্যাবস্থা। ৩ কিলোমিটার দুরে নতুন চর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে হয় কোমল মতি বাচ্চাদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য।
বর্ষা এলেই প্রকল্পজুড়ে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। কাঁচা রাস্তাগুলো যেন জলকাদায় ডুবে গিয়ে পথ নয়, হয়ে ওঠে বন্ধ দরজা। কোনোরকমে পলিথিন আর পুরোনো কাপড়ে ছাউনি দিয়ে দিন পার করছেন অনেকে।
ঘর গুলো ভেঙে পড়ছে,সাথে ভেঙে পড়ছে একেকটা পরিবারের স্বপ্ন।সরকারি সহযোগিতার কথা থাকলেও বাসিন্দারা জানালেন, এখন পর্যন্ত তারা কোনো ভিজিডি বা ভিজিএফ কার্ডের সুবিধা পাননি। দিন দিন তাদের জীবন হয়ে উঠছে আরও দুর্বিষহ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, “ঘরগুলো অনেক পুরনো, তাই নষ্ট হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ কবে? আর কতকাল কষ্টে থাকতে হবে এই মানুষগুলোকে?
তারা যাদের জন্য ভোট দেয়, যাদের আশায় ঘুমায়, তাদের সেই আশ্রয়ের ঘরই যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে তারা দাঁড়াবে কোথায়? বারুগ্রাম আবাসনের প্রতিটি ঘরের ফাটলে যেন জমে আছে দীর্ঘশ্বাস, কান্না আর অনিশ্চয়তার গন্ধ। আজ, এই ঘরগুলো শুধু ইটের গাঁথুনি আর টিনের ছাউনি নয়—এগুলো একেকটি জীবন্ত ইতিহাস, লড়াইয়ের গল্প। আর সেই গল্পের শেষে যদি না থাকে রাষ্ট্রের সহানুভূতি, তাহলে এই সমাজের মানবতা কোথায়?
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে দেশের মানুষ যখন ক্ষুধা দারিদ্র্য মুক্ত বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে উন্নয়নের শিখরে পৌছার। তাঁদের মধ্যথেকে বারুগ্রাম যেন আরেকটি ‘ভুলে যাওয়া অধ্যায়’ না হয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের জাগরণে নতুন করে বাঁচুক এই মানুষগুলো।