
স্টাফ রিপোর্টার ( মোঃ হাসান খান)
ফেনীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায় ঘোষণা হয়েছে। এতে আগে মৃতুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে ২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, ৪ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও ১০ জনকে খালাস দেন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ আলোচিত এ মামলার রায় দেন। এ দিন সকাল ১০টা ৪০ মিনিট থেকে রায় পড়া করেন আদালত।
যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে তারা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে আসে। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার পেপারবুক ছাপানোর কাজ শেষ করা হয়। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি শুনানির জন্য এই বেঞ্চ নির্ধারণ করেন।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো বিচারিক আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই সাজা অনুমোদনের জন্য মামলার সব নথি হাইকোর্টে পাঠাতে হয়। সে অনুযায়ী এ মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হয়েছিল। অভিযোগ গঠনের পর মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ করা হয়।
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন নুসরাতের মা শিরীন আখতার। এরপর পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে।
অধ্যক্ষকে কারাগার থেকে মুক্ত করার চেষ্টা এবং নুসরাতকে চাপে রাখার জন্য তার অনুসারীরা নানা তৎপরতা চালায়। ৩ এপ্রিল কারাগারে গিয়ে সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে কয়েকজন আসামি আলোচনা করেন। পরদিন ৪ এপ্রিল মাদরাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদরাসায় গেলে নুসরাতকে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়।
দগ্ধ নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় এনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত।
এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল মামলা করেন। ২৮ মে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এরপর ২০ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।
সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত ২৪ অক্টোবর রায়ের দিন ধার্য করেন। নির্ধারিত দিনেই ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, মহিউদ্দিন শাকিল ও মোহাম্মদ শামীম।