
মো. শারীদ মোল্লা, নয়া কণ্ঠ ডেস্কঃ
প্রতিটি গ্রামেরই কিছু মানুষ থাকেন, যাদের পরিচয় কোনো পদবি দিয়ে শেষ হয় না। তারা মানুষের স্মৃতিতে জায়গা করে নেন আচরণে, ভালোবাসায় আর নিঃস্বার্থ সেবায়। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দী উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া বাজারে এমনই এক মানুষকে ঘিরে প্রতিদিন রচিত হয় এক নীরব মানবতার উপাখ্যান।
ভোরের প্রথম আলো যখন বাজারের টিনের চাল ছুঁয়ে পড়ে, তখনই জেগে ওঠে একটি ছোট্ট আটার কল। যন্ত্রের ঘূর্ণায়মান শব্দ যেন জানিয়ে দেয়—আরও একটি কর্মমুখর দিনের শুরু। ধান, গম আর ভুট্টার বস্তা কাঁধে নিয়ে একে একে আসেন গ্রামের মানুষ। কিন্তু তারা শুধু শস্য ভাঙাতে আসেন না; সঙ্গে করে নিয়ে আসেন জীবনের নানা গল্প, দুঃখ, সংকট আর প্রত্যাশা।
সেই ছোট্ট আটার কলটির নাম ‘মেসার্স বাবুল এন্টারপ্রাইজ’। আর এর ভেতরে ঘাম ঝরিয়ে কাজ করা মানুষটি মো. বাবুল মল্লিক। সাধারণ পোশাক, মুখে মৃদু হাসি, হাতে শ্রমের চিহ্ন। প্রথম দেখায় তাকে একজন পরিশ্রমী ব্যবসায়ী বলেই মনে হবে। কিন্তু একটু পরেই বোঝা যায়, তিনি শুধু একজন শ্রমজীবী মানুষ নন; তিনি বহরপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউপি সদস্য। তবে এলাকার মানুষের কাছে তার পরিচয় আরও বড়—তিনি ‘গরিবের মেম্বার’।
এখানে ক্ষমতার কোনো দূরত্ব নেই। নেই আলাদা চেয়ার কিংবা আনুষ্ঠানিকতার দেয়াল। আটার কলের এক কোণেই বসে কেউ প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর নেন, কেউ জমিজমার জটিলতা নিয়ে পরামর্শ চান, কেউ পারিবারিক বিরোধের সমাধান খোঁজেন। যন্ত্রের অবিরাম শব্দের মাঝেই বাবুল মল্লিক মন দিয়ে শোনেন মানুষের কথা। যেন এই ছোট্ট কর্মস্থলই হয়ে উঠেছে গ্রামের মানুষের আস্থার উঠোন।
স্থানীয়দের ভাষায়, “মেম্বার সাহেবকে খুঁজতে ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হয় না। তেঁতুলিয়া বাজারের আটার কলেই তাকে পাওয়া যায়। সেখানে গেলে কাজও হয়, মনও হালকা হয়।”
১৯৮৯ সালের ১৫ অক্টোবর জন্ম নেওয়া বাবুল মল্লিকের পিতা মেহের মল্লিক। জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও তিনি নিজের পেশা বদলাননি। আজও ভোরে দোকানের তালা খুলে নিজ হাতে কাজ শুরু করেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষকে বড় করে তার পদ নয়, তার পরিশ্রম।
একান্ত আলাপচারিতায় বাবুল মল্লিক বলেন,
“মানুষের সেবা করার ইচ্ছা থেকেই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলাম। মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু নেই। এই আটার কলের আয়েই আমার সংসার চলে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমি কোনো অর্থ গ্রহণ করি না। মানুষের উপকার করতে পারলেই মনে হয় দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।”
তার কথাগুলো নিছক বক্তব্য নয়; প্রতিদিনের জীবনই যেন সেই কথার বাস্তব ব্যাখ্যা। তিনি প্রমাণ করেছেন, জনপ্রতিনিধি মানেই ক্ষমতার আসনে বসে থাকা নয়; মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটার নামই প্রকৃত নেতৃত্ব।
বহরপুরের প্রবীণরা বলেন, সময় বদলেছে, মানুষের মনও বদলেছে। তবু এখনও কিছু মানুষ আছেন, যাদের কাছে দায়িত্ব মানে মানুষের পাশে থাকা। তরুণরা বলেন, বাবুল মল্লিক তাদের কাছে রাজনীতির নয়, মানবতার একটি প্রতিচ্ছবি।
আজকের সময়ে যখন জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে নানা প্রশ্ন, অভিযোগ ও বিতর্ক উচ্চারিত হয়, তখন বাবুল মল্লিকের জীবন যেন অন্য এক বার্তা দেয়। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, জনসেবা কোনো বিলাসবহুল অফিসের চার দেয়ালে আটকে থাকে না। মানুষের জন্য আন্তরিকতা থাকলে একটি ছোট্ট আটার কলও হয়ে উঠতে পারে ন্যায়, বিশ্বাস ও আশ্রয়ের ঠিকানা।
দিন শেষে আটার কলের চাকা থেমে যায়। বাজার নিস্তব্ধ হয়ে আসে। কিন্তু থেমে থাকে না একজন মানুষের দায়বদ্ধতা। কারণ বাবুল মল্লিকের কাছে জনপ্রতিনিধিত্ব কোনো পদ নয়; এটি মানুষের প্রতি আজীবনের এক নীরব অঙ্গীকার।
তাই বহরপুর ইউনিয়নের মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন ইউপি সদস্য নন। তিনি শ্রমের মর্যাদা, সততার শক্তি আর জনসেবার এক জীবন্ত প্রতীক। আটার কলের অবিরাম শব্দের মতোই তার কর্ম আর মানবিকতার গল্প ছড়িয়ে পড়ুক আরও বহু দূর।