
জয়নাল আবেদীন, জয়পুরহাট:
এ বছরের উৎপাদিত চিনির সঙ্গে গত বছরের অবিক্রিত চিনিসহ মোট মজুত রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৯৪ দশমিক ৪৫ টন বলে জানান চিনিকল ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ষাটের দশকের স্থাপিত দেশের বৃহত্তম জয়পুরহাট চিনিকিলটি স্বাধীনতা পরবর্তীকালে লোকসান দিতে থাকে ক্রমবর্ধমান হারে। ২০২৩-২৪ মাড়াই মৌসুম থেকে জয়পুরহাট চিনিকল ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও আমদানি করা কমদামি বিদেশি চিনির কারণে বাধার মুখে পড়েছে। এখানকার চিনির উৎপাদন খরচ বেশি বলে গুণমান ভালো হলেও কমদামি আমদানি করা চিনির কাছে ধরাশায়ী হওয়ার পথে দেশীয় চিনির বাজার।
জানা গেছে, ষাটের দশকে স্থাপিত দেশের বৃহত্তম জয়পুরহাট চিনিকলটি নানা কারণে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ক্রমবর্ধমান হারে লোকসান গুণতে থাকে। মাথাভারী জনবল, আখের কম দাম ও আখচাষিদের হয়রানিসহ নানা অব্যবস্থাপনার কারণে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত লোকসান দিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে দেশের বৃহত্তম এই চিনিকল। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৮’শ কোটি টাকা পুঞ্জীভূত ঋণের বোঝা। এরপরও ২০২৩-২৪ সাল থেকে আখের ন্যায্যমূল্য ও আখচাষিদের পাওনা পরিশোধে হয়রানি বন্ধ হলে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে এই ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানটি।
জয়পুরহাট চিনিকল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ খবির উদ্দিন ঘটনার সত্যতা (পরোক্ষভাবে) স্বীকার করে বলেন, ‘চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে জয়পুরহাট চিনিকল জোনে প্রায় ৩ হাজার ৭’শ একর জমিসহ দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া আরও ২টি চিনিকল (রংপুরের শ্যামপুর ও গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জ চিনিকল) এলাকার জমিতে চাষ হওয়া প্রায় সাড়ে ৫৪ হাজার টন আখ মাড়াই হয়, যা গতবারের প্রায় সমান ও গত ৩/৪ বছরের চেয়ে অনেক বেশি।’
চলতি মাড়াই মৌসুমে চিনি উৎপাদন হয় ২ হাজার ৮০১ দশমিক ৫ টন। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, আগামী বছরে প্রায় ৬৫ হাজার টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদনও বাড়ানো সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন মোহাম্মদ খবির উদ্দিন।
এদিকে আখের ভালো দাম পেয়ে দারুণ খোশ মেজাজে রয়েছে আখচাষিরা। প্রতি কুইন্টাল আখের নগদ মূল্য পাচ্ছে ৬৫০ টাকা, এতে বেশ লাভে থাকার কথা জানায় তারা। জয়পুরহাট সদর উপজেলার পাকুরদলী এলাকার বর্গাচাষি এন্তাজুল ইসলাম, পাঁচবিবি উপজেলার আয়মা গ্রামের আখচাষি আব্দুস সামাদসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার আখচাষিরা জানায়, তারা প্রতি ক্ইুন্টাল আখের দাম পাচ্ছে ৬৫০ টাকা। এতে প্রতি বিঘা জমিতে আখ বিক্রি করে তারা পাচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা, খরচ বাদ দিলে তাদের ৩০/৪০ হাজার টাকা লাভ হয়।
চিনিকলটির দেওয়া তথ্য মতে, চিনিকলের উর্ধ্বমুখী উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। তবে বর্তমানে জয়পুরহাট চিনিকলের উৎপাদিত চিনির চেয়ে আমদানি করা চিনির বাজার দর কম হওয়ায় বিক্রি কমে গেছে এখানকার চিনি, রয়েছে গত বছরের অবিক্রীত চিনির মজুত। এ বছরের উৎপাদিত চিনির সঙ্গে গত বছরের অবিক্রিত চিনিসহ মোট মজুত রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৯৪ দশমিক ৪৫ টন বলেও জানান চিনিকল ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
এ অবস্থায় চিনিকলটির ঘুরে দাঁড়ানোর পথে আমদানি করা কমদামি চিনি বাধাগ্রস্থ করছে বলে বেশ শঙ্কিত সংশ্লিষ্টরা। জয়পুরহাট চিনিকলে উৎপাদিত চিনির মান ভালো হলেও খোলা বাজারে খুচরা দাম প্রতি কেজিতে ১৩০ টাকা, আর আমদানি করা চিনি প্রতি কেজি খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা দরে। ফলে গুণাগুণ যাচাই না করে অধিকাংশ ক্রেতারা ঝুঁকছেন আমদানি করা বিদেশি চিনি কেনায়।
জয়পুরহাট সাহেব বাজার এলাকার খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা আসলাম হোসেন, জাহির হোসেন, শাহিন ও স্টেশন রোডের সিতা রাম জানায়, জয়পুরহাট চিনিকলের চিনি আখের তৈরি, রং কিছুটা লালচে হলেও কড়া মিষ্টি ও মান সম্পন্ন। আর আমদানি করা চিনি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার হলেও হলেও মিষ্টি কম। আমদানি করা চিনির দাম কম হওয়ার কারণে ক্রেতা সাধারণ এ ধরনের চিনিই বেশি কিনছে।
দেশি ও আমদানিকৃত চিনির গুণগত মানের পার্থক্যসহ বাজারমূল্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা রতন কুমার রায় বলেন, ‘গুণগত মান সম্পন্ন আমাদের দেশি চিনি ব্যবহারে ভোক্তা সাধারণকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।’
সূত্র : ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন