
কৃষ্ণ কুমার সরকার , রাজবাড়ীঃ
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে রেলওয়ের দুটি স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে গোয়ালন্দ বাজার ষ্টেশনটি ১০ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। জনবল না থাকার কারণে বন্ধ রেলওয়ের ঐতিহ্যবাহী ওই রেলস্টেশনটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। এদিকে চলাচলকারী পাঁচটি ট্রেনের মধ্যে দুটি আন্তঃনগর ও একটি মেইল ট্রেনসহ চারটি প্রত্যাহার করায় চলাচলে দূর্ভোগে পড়েছেন যাত্রী সাধারণ। এ ছাড়া গোয়ালন্দ বাজার-গোয়ালন্দ ঘাট (দৌলতদিয়া) স্টেশনের প্রায় ৫ কিলোমিটার লাইন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, দৌলতদিয়ার গোয়ালন্দ ঘাট ষ্টেশনে প্রতিদিন দুটি আন্তঃনগর, একটি মেইলসহ মোট পাঁচটি ট্রেন বিভিন্ন রুটে নিয়মিত চলাচল করত। এর মধ্যে রাজশাহী থেকে গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনে নিয়মিত চলাচল করত মধুমতি এক্সপ্রেস নামের আন্তঃনগর ট্রেন। ২০২০ সালের ৩০ অক্টোবর ট্রেনটি প্রত্যাহার করা হয়। সেটি এখন পদ্মাসেতু হয়ে রাজশাহী-ঢাকা চলাচল করে। নকশীকাঁথা এক্সপ্রেস নামের অন্য একটি মেইল ট্রেন নিয়মিত চলাচল করত। বেসরকারিভাবে পরিচালিত ওই মেইল ট্রেনটিও গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন থেকে প্রত্যাহার করা হয় ২০২৩ সালের ১ নভেম্বরে। এর আগে খুলনা-গোয়ালন্দ ঘাট রুটে চলাচলকারী তিতুমীর এক্সপ্রেস নামের অন্য আন্তঃনগর ট্রেনটি ১৯৯৬ সালে প্রত্যাহার করে রাজশাহী-চিলাহাটি রুটে নেওয়া হয়। এদিকে পার্বতীপুর থেকে গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশন নিয়মিত চলাচল করত শিলিগুড়ি নামে পরিচিত অন্য একটি লোকাল ট্রেন। ইঞ্জিন ও বগি সংকটের কারণ দেখিয়ে ২০১২ সালের ১৩ নম্বরের ওই ট্রেনটি (শিলিগুড়ি) বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে সেখানে বেসরকারিভাবে পরিচালিত শাটল ট্রেন চলছে গোয়ালন্দ ঘাট পোড়াদহ স্টেশন রুটে।
রেলওয়ের গোয়ালন্দ ঘাট (দৌলতদিয়া) স্টেশন অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোয়ালন্দ ঘাট-খুলনা, গোয়ালন্দ ঘাট-রাজশাহী রেলপথের গোয়ালন্দ বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। প্রতিদিন ওই স্টেশন থেকে বিভিন্ন ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত করত এলাকার হাজারো মানুষ। সেখানে ষ্টেশন মাস্টার পদে একজন, সহকারী স্টেশন মাষ্টার একজন, পয়েন্টসম্যান তিনজন এবং দুজন গেটম্যানসহ সব পদে প্রয়োজনীয় লোকবল ছিল। পরে ষ্টেশন মাষ্টারসহ সব পদে জনবল শূন্য হয়ে যায়। এতে রেলওয়ের গোয়ালন্দ বাজার ষ্টেশনটি ১০ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এখন জরাজীর্ণ ইঞ্জিন অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও সরেজমিন দেখা গেছে, ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত গোয়ালন্দ বাজার-গোয়ালন্দ ঘাট (দৌলতদিয়া) পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার রেললাইন ও স্টেশন এখন অনেকটাই জরাজীর্ণ। নেই আগের মতো ট্রেনের শব্দ ও কোলাহল। লাইনে নেই পাথর বা খোয়া, কাঠের স্লিপারগুলোর অবস্থাও ভালো নেই। দেখলে মনে হয় এটি সচল নয়, দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত কোনো রেললাইন। এর ওপর দিয়েই প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে সকাল-বিকেল দুটি ট্রেন তিনবার চলাচল করছে। ট্রেন চলাচলের সময় স্লিপার ও রেল উঁচু-নিচু হয়। মাঝে মাঝে ট্রেন লাইনচ্যুতের মতো ঘটনা ঘটে এ লাইনে।
স্থানীয়রা জানান, একসময় গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে ভারত যাওয়া যেত। সেই গোয়ালন্দ বাজার-ঘাট ষ্টেশন দুটি ঐতিহ্যবাহী স্টেশন হওয়া সত্ত্বেও নেই কোনো উন্নয়ন। কয়েক বছর ধরে গোয়ালন্দ বাজার স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ, কমেছে এই রুটে ট্রেনের সংখ্যা। সারা দেশে রেলের উন্নয়ন হলেও এই ৫ কিলোমিটার রেললাইনের অবস্থা খুবই খারাপ।
গোয়ালন্দ রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গেটম্যানের অভাবে গোয়ালন্দ পৌরশহরের ব্যস্ততম ষ্টেশন সড়কের গুরুত্বপূর্ণ লেভেল ক্রসিংটি অরক্ষিত। প্রয়োজনীয় বেরিয়ার থাকলেও শাটল ট্রেনটি চলাচলের সময় ওই লেভেল ক্রসিংয়ে তা নামানো হয় না। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
গোয়ালন্দ বাজার ব্যবসায়ী পরিষদের সভাপতি সিদ্দিক মিয়া বলেন, শিলিগুড়ি নামে লোকাল ট্রেনটি বন্ধ থাকায় গোয়ালন্দ ঘাট-পার্বতীপুর রুটে এলাকার বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে তারা সড়কপথে যাতায়াত ও মালপত্র পরিবহনে বাধ্য হচ্ছেন। ট্রেনটি ফের চালুর পাশাপাশি প্রত্যাহার করা আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনগুলো চালুর দাবি জানাচ্ছি।
গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনের হকাররা পড়েছেন বিপাকে। আগে পাঁচ থেকে ছয়টি ট্রেন চলাচল করায় বেচাকেনা ভালো হতো। এখন তা হয় না। হকার কুতুব উদ্দিন বলেন, সারা দিন ষ্টেশনে প্রায় একশ পত্রিকা বিক্রি করতাম। আর এখন ট্রেন না থাকায় পত্রিকা বিক্রি অনেক গেছে। মানিক নামে এক দোকানি বলেন, এখন এ লাইনে একটির বেশি ট্রেন চলে না। এজন্য দোকানের বেচাকেনা অনেক কমে গেছে। এ ছাড়া কাষ্টমার না থাকায় লোকসানের মুখে বন্ধ করে দিয়েছেন অনেক বোর্ডিং ব্যবসা।
রেলওয়ের গোয়ালন্দ ঘাটের (দৌলতদিয়া) ষ্টেশন মাষ্টার মোসলেম উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী পাঁচটি ট্রেনের মধ্যে দুটি আন্তঃনগর ও একটি মেইল ট্রেনসহ চারটি প্রত্যাহার করায় গোয়ালন্দ ঘাট ষ্টেশনে ট্রেন সংকট হয়েছে। বর্তমান গোয়ালন্দ ঘাট-পোড়াদহ রুটে বেসরকারিভাবে পরিচালিত একটি মাত্র শাটল ট্রেন (লোকাল) চলাচল করছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।