
চুয়াডাঙ্গার অপহৃত স্কুলছাত্র রাজশাহীতে উদ্ধার
মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুইজন গ্রেপ্তার
মোস্তাফিজুর রহমান লিটন
রাজশাহী ব্যুরো
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে অপহৃত ১৪ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রকে রাজশাহী মহানগরী থেকে জীবিত উদ্ধার করেছে র্যাব-৫। এ ঘটনায় অপহরণ চক্রের মূলহোতা হিসেবে অভিযুক্ত একজনসহ দুইজনকে পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা দায়েরের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া ও বোয়ালিয়া থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তাররা হলেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নারায়ণপুর এলাকার মোঃ মাহতাব খাঁর ছেলে মোঃ সুমন খাঁন (৩৭) এবং রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া থানার আলীগঞ্জ মধ্যপাড়া এলাকার মৃত রফিকের ছেলে মোঃ রুবেল শেখ (৩৮)।
র্যাব-৫ সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্র নাইম উদ্দিন (১৪) চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার প্রতাবপুর দক্ষিণপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং মদনা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
গত ২২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১১টা ৫ মিনিটের দিকে প্রতিদিনের মতো বাড়ির সামনে পাকা রাস্তায় খেলতে বের হয় নাইম। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেলেও সে বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে সন্ধান করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে নাইমের বাবা দর্শনা থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
মুক্তিপণ দাবি, হত্যার হুমকি
ঘটনার পরদিন ২৩ আগস্ট সকালে বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। সকাল আনুমানিক ৭টা ১৫ মিনিটের দিকে নাইমের বড় ভাই মাসুদ রানার মোবাইল ফোনে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা কয়েকটি ছবি পাঠায়। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ছবিগুলোতে নাইমের মুখ টেপ দিয়ে আটকানো এবং হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়।
ছবি পাঠানোর পর অজ্ঞাত ব্যক্তিরা নাইমকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে পরিবারের কাছে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে নাইমকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বিষয়টি জানার পর পরিবারের সদস্যরা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করেন। ঘটনায় দর্শনা ও আশপাশের এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পরে নাইমের মামা মোঃ আব্দুল আলীম বাদী হয়ে দর্শনা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণের অভিযোগে মামলা করেন। ২৩ আগস্ট দায়ের করা মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর সংশোধিত ধারার ৭/৮/৩০ উল্লেখ করা হয়েছে।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে র্যাবের অভিযান
মামলা দায়েরের পর অপহৃত শিশুকে উদ্ধারে তৎপর হয়ে ওঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার পর র্যাব-৫, রাজশাহী সদর কোম্পানির একটি বিশেষ আভিযানিক দল অভিযান শুরু করে।
র্যাব জানায়, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপহৃত শিশুর অবস্থান শনাক্ত করার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায়।
এরই ধারাবাহিকতায় ২৪ আগস্ট রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া থানাধীন লক্ষ্মীপুর মোড় এলাকায় একটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালায় র্যাবের বিশেষ দল। এ সময় অপহৃত স্কুলছাত্র নাইম উদ্দিনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে অপহরণ চক্রের মূলহোতা হিসেবে অভিযুক্ত মোঃ সুমন খাঁনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে সুমনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানাধীন স্বর্ণপট্টি আবাসিক হোটেল এলাকায় পৃথক অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপহরণ চক্রের সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত মোঃ রুবেল শেখকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
জিজ্ঞাসাবাদে সম্পৃক্ততার তথ্য
র্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তি অপহরণের ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তবে ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, শিশুটিকে কোথায় রাখা হয়েছিল এবং মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনার সঙ্গে আর কারা জড়িত ছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে।
র্যাব জানিয়েছে, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অপরাধীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া ১৪ বছর বয়সী স্কুলছাত্র নাইম উদ্দিনকে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অন্যদিকে গ্রেপ্তার দুই আসামির বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
মামলা দায়েরের এক দিনের মধ্যেই অপহৃত শিশুকে উদ্ধার এবং ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুইজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় স্বস্তি ফিরেছে নাইমের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে। একই সঙ্গে শিশু অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।