
ঢাকা জেলা ব্যুরো চীফ: সৈয়দ উসামা বিন শিহাবঃ
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে আবারও যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছাতে লাখো মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। অথচ সেই গণপরিবহনেই যদি আগুনের ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা কোথায়—এ প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়ে উঠছে। নগরীর সড়কে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি পরিবহন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা, নজরদারি এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।
যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা অন্য অনেক দুর্ঘটনার তুলনায় দ্রুত বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। একটি বাসের ভেতরে একসঙ্গে বহু যাত্রী অবস্থান করেন। হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া ও উত্তাপ পুরো গাড়িতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আতঙ্কিত যাত্রীরা দ্রুত বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দরজা আটকে যাওয়া, জরুরি বহির্গমন পথ অকার্যকর থাকা কিংবা বাসের আশপাশে যানজট থাকলে প্রাণ রক্ষার সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে একটি অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তের মধ্যেই বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে রাজধানীর যানজটপূর্ণ সড়কগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, পাশাপাশি চলাচলকারী অসংখ্য যানবাহন এবং রাস্তার সীমিত জায়গার কারণে জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু আগুন নেভানোর ব্যবস্থা থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; আগুন লাগার আগেই ঝুঁকি প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এখানেই সামনে আসছে পরিবহন ব্যবস্থাপনার মৌলিক কিছু প্রশ্ন। রাজধানীতে চলাচলকারী প্রতিটি যাত্রীবাহী বাসের কারিগরি অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না, বৈদ্যুতিক সংযোগে ত্রুটি রয়েছে কি না, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিরাপদ কি না এবং ইঞ্জিনসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কারণ সামান্য বৈদ্যুতিক ত্রুটি, জ্বালানি ব্যবস্থার অসংগতি কিংবা অবহেলাজনিত রক্ষণাবেক্ষণও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট ঘটনার কারণ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন উঠছে যানবাহনের ফিটনেস সনদ ও বাস্তব নিরাপত্তার মধ্যকার ব্যবধান নিয়েও। কোনো বাসের কাগজপত্র ঠিক থাকলেই সেটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। নিয়মিত যান্ত্রিক পরীক্ষা, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার পর্যবেক্ষণ, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের কার্যকারিতা এবং জরুরি বহির্গমন পথ সচল রাখা বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে অনিয়ম বা অবহেলা থাকলে তা শনাক্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিবহন মালিকদের দায়িত্বও কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে আয় করা যেমন তাদের ব্যবসায়িক অধিকার, তেমনি যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শুধু বাস রাস্তায় নামিয়ে নির্ধারিত ট্রিপ সম্পন্ন করাই পরিবহন পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব নয়। প্রতিটি যাত্রার আগে গাড়ির নিরাপত্তা যাচাই, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং চালক-সহকারীদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত করা জরুরি। নিরাপত্তার প্রশ্নে ব্যয় সংকোচন কিংবা অবহেলার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।
অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি কেবল পরিবহন মালিক বা চালকের ওপর ছেড়ে দিলেও চলবে না। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি, কার্যকর পরিদর্শন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। ফিটনেসবিহীন, ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ছাড়া চলাচলকারী যানবাহন শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বাসে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও সেটি ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় আছে কি না, চালক ও সহকারীরা সেটি পরিচালনা করতে জানেন কি না, তাও যাচাই করতে হবে।
অন্যদিকে, প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা অত্যন্ত জরুরি। আগুনের সূত্রপাত কোথা থেকে, কীভাবে আগুন ছড়িয়েছে, বাসটির যান্ত্রিক অবস্থা কেমন ছিল এবং সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের অবহেলা ছিল কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করতে হবে। তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ এবং অপরাধ বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। কোনো ঘটনাকে শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যা দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ যাত্রীদের মধ্যেও নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বাসে ওঠার পর জরুরি বহির্গমন পথ কোথায়, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কোথায় রাখা আছে এবং বিপদের সময় কীভাবে দ্রুত বের হতে হবে—এসব বিষয়ে যাত্রীদের প্রাথমিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। তবে যাত্রীদের সচেতনতার ওপর নির্ভর করে পরিবহন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কমিয়ে দেখার সুযোগ নেই। নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পরিচালনাকারী ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর।
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। প্রতিটি বাসের নিরাপত্তা নিরীক্ষা, নিয়মিত কারিগরি পরিদর্শন, চালক-সহকারীদের প্রশিক্ষণ, কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি চিহ্নিত করতে পরিবহন খাতে নিয়মিত নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের জীবন কোনোভাবেই পরিবহন ব্যবসার অবহেলা কিংবা প্রশাসনিক উদাসীনতার কাছে জিম্মি হতে পারে না। রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী প্রতিটি যাত্রীর নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর অধিকার রয়েছে। তাই যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত, প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
রাজধানীর রাজপথে মানুষ গণপরিবহনে উঠবেন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রত্যাশা নিয়ে, মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে নয়। বারবার অগ্নিকাণ্ডের পরও যদি কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না হয়, তাহলে পরিবহন খাতের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হবে। এখন আর আশ্বাস নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ, কঠোর তদারকি এবং যাত্রীদের জীবন রক্ষায় বাস্তবভিত্তিক কার্যকর উদ্যোগ।