
ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হোসেন:
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ছায়াযুদ্ধ যখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে, তখন বিশ্বরাজনীতির দাবার বোর্ডে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তান। একদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সঙ্গে জটিল সামরিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব—সব মিলিয়ে পাকিস্তান এখন এক অদৃশ্য অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন।
ভূ-রাজনৈতিক দোলাচল
ইরানের ওপর হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানের গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণী মহলে যে আলোচনার ঝড় উঠেছে, তার মূলে রয়েছে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’। পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের কথা বললেও, বাস্তব রাজনীতিতে দেশটির হাত পা বাঁধা। একদিকে ওয়াশিংটনের সাথে আইএমএফ (IMF) ঋণ ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্যদিকে প্রতিবেশী তেহরানের সাথে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি। পাকিস্তানের জন্য এই যুদ্ধ কেবল একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ নয়, বরং এটি তাদের নিজ ভূখণ্ডে অস্থিতিশীলতা আসার এক অশনিসংকেত।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যা রয়েছে
পাকিস্তানি সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় তিনটি বিষয় প্রধান্য পাচ্ছে:
সীমান্ত নিরাপত্তা: ইরানের ভেতরে অস্থিরতা মানেই পাকিস্তানের বেলুচিস্তান সীমান্তে বিদ্রোহ ও চোরাচালান বৃদ্ধির আশঙ্কা।
জ্বালানি প্রকল্প: বহুল আলোচিত ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন খাদের কিনারায়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে পাকিস্তান এমনিতেই পিছুটান দিচ্ছিল, বর্তমান সংঘাত সেই দ্বিধাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আঞ্চলিক ভারসাম্য: পাকিস্তান কোনোভাবেই চায় না তাদের আকাশসীমা বা ভূমি কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হোক। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক পদক্ষেপে পাকিস্তানের পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা দেশটিতে চরম জনরোষ তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যতের ছক: পাকিস্তান কি নিরপেক্ষ থাকতে পারবে?
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে পাকিস্তানের সামনে পথ খুবই সংকীর্ণ। যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের হামলার পরিধি বাড়ায়, তবে পাকিস্তান “কৌশলগত নিরপেক্ষতা” বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তবে এই নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হবে যদি মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আমূল বদলে যায়।
পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তারা কীভাবে এই ত্রিমুখী চাপ সামলায়। একদিকে ইরানকে শান্ত রাখা, অন্যদিকে পশ্চিমা মিত্রদের ক্ষুব্ধ না করা। পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক নাজুক পরিস্থিতি তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে অত্যন্ত নমনীয় হতে বাধ্য করছে।
উপসংহারই
রানের ওপর এই হামলা কেবল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর আঘাত নয়, বরং এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। পাকিস্তান যদি এই সংকটে সঠিক কূটনৈতিক প্রজ্ঞা দেখাতে না পারে, তবে যুদ্ধের আগুনের হল্কা তাদের ঘরের দরজায় পৌঁছাতে দেরি হবে না। তেহরানের আকাশে যে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে, তার রেশ ইসলামাবাদকে অনেকদিন বয়ে বেড়াতে হতে পারে।