
মো:ফারুক আহমেদ (টাঙ্গাইল)
টাঙ্গাইলে গোপালপুরে যমুনা-তীরের নলিন বাজারের ব্যক্তমি চা দোকান লাইব্রেরি সুজন মিয়া চা দোকান। যেখানে নদীর অবিরাম স্রোতধারা আর মাটির কণায় মিশে আছে গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবনবোধ, সেখানে এক অখ্যাত চা-বিক্রেতার দৃঢ় প্রত্যয়ে গড়ে উঠেছে জ্ঞানের এক অভিনব মন্দির। সুজন মিয়া-যার জীবনসংগ্রাম কেটেছে দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে, যার দিনান্ত হয় চায়ের কাপ পরিষ্কার করে, সেই সুজন আজ বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকা অক্ষরজগতকে করে তুলেছে সাধারণ মানুষের নিত্যসঙ্গী। মুক্তিযোদ্ধা নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আনজু আনোয়ারা ময়নার এই অনন্য উদ্যোগ অনুপ্রেরণার দূরদর্শী চিন্তার উৎস, এখন ‘ময়না মুক্ত পাঠাগার’ তিনি কেবল বিদ্যালয়ের চৌকাঠেই শিক্ষার আলো বিকিরণ করেননি; তার দৃষ্টি প্রসারিত হয়েছে সমাজের প্রান্তসীমায় অবস্থিত মানুষের মাঝে জ্ঞানবিস্তারের অমোঘ আকাঙ্ক্ষায়। স্কুলসংলগ্ন সুজন মিয়ার ক্ষুদ্র চায়ের দোকানে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন এক অসামান্য সম্ভাবনা-একটি মুক্ত পাঠাগার, যেখানে চায়ের তৃষ্ণার পাশাপাশি মিটবে মনের তৃষ্ণাও। তারই অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এবং ছায়ানীড় প্রকাশনীর নির্বাহী পরিচালক লুৎফর রহমানের সহায়তায় এই স্বপ্ন রূপ নিয়েছে ‘ময়না মুক্ত পাঠাগার’। সুজনের দোকানের এক প্রান্তে সজ্জিত হয়েছে এই পাঠাগার। এখানে গ্রন্থসজ্জা করা হয়েছে বিন্যাসের সুচিন্তিত পরিকল্পনায়-আনজু আনোয়ারা ময়নার লেখা, আরসিতে জল ছবি কবিতার বই ও স্মৃতি কথা মুলক গল্পের বইসহ শিশু-কিশোরদের জন্য রূপকথা ও শিক্ষামূলক গল্প, কৃষক-মজুরদের জন্য কৃষি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রয়োজনীয় গ্রন্থ, তরুণদের জন্য উপন্যাস ও কবিতা, আর বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সাহিত্য। প্রতিদিন ভোরের প্রথম রোদ্দুর থেকে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা পর্যন্ত এই পাঠাগারে আসেন নানা বয়সী, নানা পেশার মানুষ। যেখানে একসময় টেলিভিশনের রঙিন পর্দা কিংবা মোবাইলের ভার্চুয়াল জগতে মগ্ন থাকত স্থানীয়রা, আজ সেখানে বইয়ের পাতায় তারা খুঁজে পাচ্ছে জীবনের নতুন অর্থ। এই উদ্যোগ কেবল একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার গল্পই নয়; এটি সামষ্টিক চেতনার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সুজন মিয়া প্রমাণ করেছেন যে, জ্ঞানার্জনের কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা সময় নেই। একটি চায়ের দোকানও হতে পারে প্রজ্ঞার মিনার। তার এই প্রচেষ্টা স্থানীয় যুবসমাজকে মাদক ও অলসতার অন্ধকার থেকে টেনে এনে জ্ঞানের আলোয় স্নাত করছে। এখানে বই পড়ার মাধ্যমে গ্রামবাসীরা শিখছে নতুন দক্ষতা, জানছে তাদের অধিকার, আর গড়ে তুলছে সুস্থ সামাজিক বন্ধন। যদিও এই পথ মসৃণ নয়। পাঠাগারটির বর্তমান বইয়ের সংগ্রহ সীমিত, পাঠকসংখ্যা বাড়াতে প্রয়োজন ব্যাপক প্রচারণা, আর স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন স্থানীয় প্রশাসন ও বিত্তবানদের আর্থিক সহায়তা। সুজন মিয়া আশা করেন, একদিন তার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস রূপ নেবে একটি পূর্ণাঙ্গ গণগ্রন্থাগারে, যা হবে গোপালপুরের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু। সুজনের এই গল্প আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মহৎ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে নগণ্য এক প্রয়াস থেকেও। তার চায়ের দোকান আজ শুধু পানীয় পরিবেশনের স্থান নয়, এটি পরিণত হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও সাহিত্যচর্চার পীঠস্থানে। এই অন্ধকার যুগে, যখন মানুষ বস্তুগত সম্পদে মোহাচ্ছন্ন, তখন সুজন মিয়ার মতো মানুষেরা আমাদের দেখিয়ে দেন-জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার পথ কখনোই রুদ্ধ হয় না। একটি বই হাজার হৃদয়ে আলোর সঞ্চার করে। সুজন মিয়া তার ক্ষুদ্র চায়ের দোকানে সেই আলো জ্বালিয়েছেন-এখন কেবল প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই আলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার। এই উদ্যোগ শুধু গোপালপুরের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে এগিয়ে এলে এমন অসংখ্য ‘ময়না মুক্ত পাঠাগার’ গড়ে উঠতে পারে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যা জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করবে আগামী প্রজন্মকে।