
মোস্তাফিজুর রহমান লিটন রাজশাহী ব্যুরোঃ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১ সেপ্টেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৮ সালের এই দিনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় দলটি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, দীর্ঘ সময় বিরোধী দলেও থেকেছে। আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক সংকট, সাফল্য-ব্যর্থতা ও নানা অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন পেরিয়ে বিএনপি বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
বিএনপির প্রতিষ্ঠার পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দেশের রাজনীতিতে তৈরি হওয়া শূন্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাকে সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক মত, পেশা ও শ্রেণির মানুষকে নিয়ে দলটি গঠনের মাধ্যমে তিনি বিএনপিকে একটি বিস্তৃত ও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টিও বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি নতুন করে সংগঠিত হয়। ১৯৮০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সক্রিয় ভূমিকা এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং সরকার গঠন দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সরকার পরিচালনার পর বিএনপি আবার বিরোধী দলে যায়। পরে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে দলটি রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার দাবি করে। তবে একই সময়ে রাজনৈতিক বিরোধ, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক নানা অভিযোগও দলটির ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলে।
২০০৬-০৭ সালের রাজনৈতিক সংকট বিএনপির রাজনৈতিক যাত্রায় বড় ধরনের মোড় তৈরি করে। ওয়ান-ইলেভেনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি বিরোধী রাজনীতিতে থেকে আন্দোলন, মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবাস এবং সাংগঠনিক নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়।
এই দীর্ঘ সময়ে দলটির নেতৃত্ব, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নানা প্রশ্নও উঠেছে। একদিকে সরকারবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতা দলটির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপি তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা করেছে এবং রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
পরবর্তী সময়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপির সামনে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসায় দলটির সামনে যেমন দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি পরিণতি এসেছে, তেমনি বেড়েছে জনগণের প্রত্যাশা ও দায়িত্ব।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় ফেরার পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হবে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর তৃণমূল পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা, প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সাংগঠনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। চাঁদাবাজি, দখল, সন্ত্রাস, অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দলের ভাবমূর্তির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নের পাশাপাশি অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সে বিষয়ে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বিএনপির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রশিক্ষণ। বিভিন্ন মত ও পেশার মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দলটিকে ভবিষ্যতের রাজনীতির জন্য আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে হবে। নিয়মিত রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, নতুন নেতৃত্ব তৈরি, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার করা গেলে সংগঠন আরও কার্যকর ও টেকসই হতে পারে।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিএনপির সামনে রয়েছে বড় ধরনের প্রত্যাশা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বিশেষ করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তার ওপর সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা অনেকাংশে নির্ভর করবে। শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করে তোলার বিষয়টিও সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে থাকবে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও বিএনপির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। ক্ষমতার এককেন্দ্রিক ব্যবহার এড়িয়ে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বিএনপির রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়তে পারে।
৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপির রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো এবং উল্লেখযোগ্য জনভিত্তি। একই সঙ্গে রয়েছে অতীতের নানা বিতর্ক, রাজনৈতিক ভুল এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন এবং খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের উত্তরাধিকারকে ধারণ করে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব কীভাবে দলটিকে আধুনিক, গণতান্ত্রিক, জনমুখী ও জবাবদিহিমূলক সংগঠনে রূপান্তর করতে পারে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই শুধু অতীতের সাফল্য স্মরণের উপলক্ষ নয়; বরং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দায়িত্ব নির্ধারণেরও সময়। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে বিএনপি জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে এবং নিজেদের সংগঠনকে কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক করতে পারে—আগামী দিনের রাজনীতিতে দলটির সাফল্য অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করবে।