
রাজশাহী ব্যুরোঃ
‘নদী বাঁচাও, জীবন বাচাঁও, বাঁচাও বাংলাদেশ’ শিরোনামে খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের সকল নদ-নদী দখল দূষণ বন্ধ ও নদীর প্রবাহ জীবন্ত রাখার দাবিতে নদী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। নদী সমাবেশে রাজশাহী নগরের বিষাক্ত বর্জ্যে নদী-বিল ধ্বংস: জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষার দাবির পাশাপাশি বর্তমান সময়ে খাল খনন কর্মসূচীর ম্যাধমে নদীকে ‘খাল’ আখ্যায়িত করার প্রবণতা বন্ধের জোর দাবি জানানো হয়েছে।
রাজশাহী গ্রিন কোয়ালিশন, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম ও বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক (BARCIK) এর যৌথ আয়োজনে উক্ত নদী সমাবেশটি আজ( ১৪ মার্চ ২০২৬) শনিবার সকাল ১১ ঘটিকায় পবা উপজেলার বড়গাছি সূর্যপুর জেলেপাড়া সংলগ্ন বারনই নদী পাড়ে অনুষ্টিত হয়। এতে সভাপ্রধান হিসেবে ছিলেন পবা উপজেলা গ্রিন কোয়ালিশনের সভাপতি মোসা: রহিমা খাতুন, নদী ও পরিবেশ বিষয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন মো. মাহবুব সিদ্দিকী, নদী দূষণ ও কৃষকের উৎপাদনের সমস্যা বিষয়ে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তানোর উপজেলার স্বশিক্ষিত কৃষি গবেষক ও জাতীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত কৃষক নুর মোহাম্মদ, বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর পরিচালক শেখ মেহেদী মোহাম্মদ, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান, ইসিতা ইয়াসমিন, সিনিয়র সদস্য সম্রাট রায়হান, আলমাস আলীসহ স্থানীয় বিভিন্ন পেশাজীবীর মানুষ। সমাবেশটির সঞ্চালনা করেন বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম।
রাজশাহী নগরের অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে নগরসংলগ্ন নদী, বিল ও জলাধারসমূহ বর্তমানে মারাত্মক দূষণ, দখল ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। অবিলম্বে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এই সংকট রাজশাহীর পরিবেশ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। একই সাথে বরেন্দ্র জনপদে মারাত্বক পরিবেশ বিপর্যয় নেমে আসবে।
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন- পদ্মার প্রবাহ থেকে স্বরমঙ্গলা নদী, বারনই নদী, নবগঙ্গা ও উত্তরের ঐতিহাসিক নদী করতোয়াসহ ইত্যাদি নদী ও খালগুলো দিনে দিনে ধ্বংস করা হয়েছে। নবীণ প্রজন্ম এখন জানেইনা এমন নামে কোন নদী ছিলো এই জনপদে। বিভিন্ন সময়ে নগর প্রকৌশলীরা নগরের এসব নদী, খাল বা ড্রেনে রুপান্তরিত করেছে। নানামূখী উন্নয়নের কারনে এসকল নদী এখন ড্রেনে পরিণত হয়েছে। তিনি আরো বলেন- বর্তমান খাল কাটা কর্মসূচীর মাধ্যমে নদীগুলো খাল নামে আ্যখায়িত করার প্রবনতা দেখা যাচ্ছে। এভাবে নদীর নাম পরিবর্তন করে যদি খাল নামকরণ বা খালে পরিণত করা হয়, সেটা ভয়াবহ ক্ষতি হবে। কারন সরকার নদী কখনো লিজ দিতে পারেনা, খাল দিতে পারে, তাই এই নদীগুলোর নাম কৌশলে ‘খাল’ নামকরণে একসময় নদী খেকো এবং ভুমি দস্যুরা এসব দখল করবে। যার উদাহরণ হিসেবে তিনি রাজশাহী শহরের ভেতর দিয়ে বারাহী এবং নবগঙ্গা নদী সহ বিভিন্ন নদীর বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
বারনই নদী পাড়ের জেলে পাড়ার জয়া ঘোষ বলেন- নদীতে দূষিত কালো কুচকুচে পানি, বাধ্য হয়ে ব্যবহার করতে হয়, এরফলে আমাদের চুলকানি এবং রোগবালাই লেগেই তাকে।
মালতী রানী বলেন-“ আগে আমরা নদীতে হাঁস পালতাম, এখন আর হাঁস নদীর পানিতে নামতে পারেনা, নামেনা, নামলেও অনেক সময় বিষাক্ত পানির কারনে মরে যায়।
নদী পাড়ের কৃষক ও সংস্কৃতি কর্মী জুয়েল রায়হান বলেন- একসময় প্রচুর মাছ ছিলো নদীতে, এখন আর মাছ নেই। তিনি আরো বলেন- রাজশাহী শহরের বিভিন্ন ড্রেন ও নালা দিয়ে এই দূষিত কালো পানিগুলো আসে, প্লাস্টিক এবং অপচনশীল বিষাক্ত জিনিস পানিগুলো নষ্ট করছে।
কৃষক নুর মোহাম্দ বলেন- শিব নদীকে মেরে ফেলা হয়েছে উজানে বদ্দিপুরে উৎসমুখে বাঁধ দিয়ে, আবার পদ্মা বা গঙ্গা থেকে যেসকল নদী বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতো সেগুলোও উৎসুখে সুইচ গেট দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। এখন নগরের দূষিত বর্জ্য আমাদের বিলগুলোর কৃষি নষ্ট করছে। তিনি আরো বলেন- বিলগুলোতে দূষিত পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা, জলজ উদ্ভিদের ধ্বংস, মাছ ও দেশীয় প্রজাতির বিলুপ্তি, কৃষিজমিতে দূষিত পানি প্রবেশ করে হাজার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি থেকে যাচ্ছে। এমনকি এই দূষিত পানি নিম্নপ্রবাহে নাটোর জেলার চলন বিল পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন- বর্তমান সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রতি রক্ষার জন্য ‘দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সেল গঠন করে কাজ শুরু করেছে, তালিকাও তৈরী করছে স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো। কিন্তু অতি পরিতাপের এবং ভয়ংকর বিষয় যে, এটি শুধু খাল খনন কর্মসূচীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। এই প্রকল্পের নামে বিভিন্ন নদীগুলোকে ‘খাল’ নামে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। নদীকে নদীর নামেই রাখতে হবে, নদী কখনো খাল করা যাবেনা।
উক্ত সমাবেশে গ্রিন কোয়ালিশন টিমের গষেকদের মাঠ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। তাতে বলা হয়- নগরীর দূষিত বর্জ্য রাজশাহী নগরীর পাশে সাপমারার বিল, বগমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড় বাড়িয়া বিল,
কর্ণাহার বিলসহ এমনকি বাংলাদেশের বৃহত্তম বিল নাটোরের চলন বিলসহ এর সাথে সংযুক্ত বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক বিলের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ কৃষিউৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এসব বিল ঐতিহাসিকভাবে কৃষি সেচ, মাছ উৎপাদন এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বিগুলোতে দূষিত পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা, জলজ উদ্ভিদের ধ্বংস, মাছ ও দেশীয় প্রজাতির বিলুপ্তি, কৃষিজমিতে দূষিত পানি প্রবেশ করে হাজার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি থেকে যাচ্ছে। এমনকি এই দূষিত পানি নিম্নপ্রবাহে নাটোর জেলার চলন বিল পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে, যা উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ জলাধার বাস্তুতন্ত্র । এর ফলে আঞ্চলিক পর্যায়ে পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য সংকট এবং কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। দূষিত পানিতে চাষাবাদ করলে, মাটির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা, ফসলহানী, ফসলে ক্ষতিকর উপাদান জমার সম্ভাবনা, দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা সংকট, কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি বৃদ্ধিসহ নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের প্রশ্ন আজ গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমির ফসল না পাওয়ায় কৃষক নিস্ব হয়ে জমি বিক্রি করছে। কৃষি জমিগুলো অকৃষিখাতে চলে যাচ্ছে। এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা সংকটে পড়বে। পর্যবেক্ষণ টিম উক্ত দূষণ এবং সংকটের কারনে জনস্বাস্থ্য ও সামজিক প্রভাবে দিকগুলোও তুলে ধরেন। তাতে বলা হয়- দূষণের ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে চর্মরোগ, পানিবাহিত রোগ এবং দুর্গন্ধজনিত শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়াও, মৎস্যজীবীরা জীবিকা হারাচ্ছেন, কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী দূষণের বোঝা বহন করছে- এগুলো এটি একটি পরিবেশগত ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
নদী সমাবেশ থেকে ৭ দফা দাবি তুলে ধরা হয়:
০১. খাল খনন কর্মসূচীর ম্যাধমে নদীকে ‘খাল’ নামকরণ বন্ধ করতে হবে।
০২. অবিলম্বে রাজশাহী নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাজশাহী নগরের সকল তরল বর্জ্য শোধন ছাড়া নদী ও বিলসমূহে প্রবাহ বন্ধ করতে হবে।
০৩. খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের জলাধারগুলো সুরক্ষা, সংরক্ষণে, নদী খাল খননে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
০৪. সকল শিল্প, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ETP) নিশ্চিত ও কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু। দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
০৫. নদী ও বিলসমূহে সরাসরি ড্রেন সংযোগ বন্ধ এবং দূষণের উৎস শনাক্তে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন। স্বচ্ছ তদন্ত রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
০৬. সাপমারার বিল, বগমারি বিল, ভূগরোইল বিল, পাইকরের বিল, বড় বাড়িয়া বিলসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিল ও নদীর পানি ও মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে ফলাফল প্রকাশ। জনস্বাস্থ্য ও কৃষি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিবেশ মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
০৭. নদী-বিল দখল ও ভরাট বন্ধ করে সমন্বিত পুনরুদ্ধার মাস্টারপ্ল্যান স্থানীয় জনগোষ্ঠী, তরুণ-যুব, পরিবেবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।