
ইট, বালু, খোয়া সাপ্লাইয়ার থেকে শতকোটি টাকার মালিক যুবলীগ নেতা রনি।
রাজশাহী ব্যুরো ঃ রাজশাহী মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌরিদ আল মাসুদ রনি এক সময় বিভিন্ন ঠিকাদারের অধিনে ইট, বালু, খোয়া সরবরহকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মাত্র ৬০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি বালু খোয়া সরবরাহ করলেও সোনার কাঠির ছোঁয়ায় রনি শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন ।
চড়েন বিলাশ বহুল গাড়িতে। রয়েছে আলিশান বাড়ি। এক সময়ের বালু, খোয়া সাপ্লাইয়ার হলেও পরে করেছেন রিথিন এন্টারপ্রাইজ নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। খুব অল্প সময়ে যুবলীগ নেতা রনি অঢেল সম্পদের সাথে গড়ে তুলেন ত্রাসের রাজত্ব। মহানগর যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক থেকে টাকার বিনিময়ে পেয়েছেন সাধারণ সম্পাদকের মত পদ। মূলত রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটনের আর্শিবাদপুষ্ট হওয়ার পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অঢেল সম্পদ, যুবলীগের বড় পদসহ পুরো রাজশাহী মহানগরী ছিল তার হাতের মুঠোয়। আর এ ক্ষমতা বলে এমন কোনো অপকর্ম নেই তিনি করেন নি।
সাল টা ২০০৪-৫। সে সময় ভবঘুরে জীবন ছিল যুবলীগ নেতা রনির। লোকজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে ৬০ হাজার টাকা পুঁজি করেন। সেই পুঁজি দিয়ে তিনি ঠিকাদারের কাছে বালু, খোয়া সরবরাহ শুরু করেন। ওই সময় তার সাথে ছিল হাতে গোনা চার থেকে ৫ জন ব্যক্তি। যারা দিনমুজুর হিসাবে রনির সাথে কাজ করতেন। এভাবেই চলেছে ২০০৯ সাল পর্যন্ত। ক্ষমতার পালাবদলে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। একই সাথে রাসিকের মেয়র হিসাবে প্রথমবার নির্বাচিত হন লিটন। এই দুটিকে পুঁজি করেন রনি। বালু ও খোয়া সাপ্লাইয়ার থেকে রাসিকের ঠিকাদার হন রনি। এই ঠিকাদারি ব্যবসায় ভাগ্য খুলে যায় তার। প্রথম দিকে তিনি অন্যের কাজ কিনে ঠিকাদারী শুরু করেন। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে তিনি সাবেক মেয়রের লিটনের কাছের মানুষ হয়ে যান। আর এরপর থেকে একের পর এক বাগিয়ে নেন বড় বড় কাজ। কখনো কাজ করে, আবার কখনো কাজ না করেই তিনি বিল তুললেও তাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কারো ছিল না।
আওয়ামী লীগপন্থী ঠিকাদারদের মতে, রাসিকের কোনো কাজ পেতে হলে রনির সাথে যোগাযোগ করতে হবে, নইলে কেউ কাজ পাবে না। অন্য কোনো ঠিকাদার কখনো বড় কোনো কাজ পেলে সেই টেন্ডার ছিনতাই করা হতো। নয় তো ঠিকাদারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দিতো রনি।
সূত্র মতে, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল, এই আট বছর রনির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রিথিন এন্টারপ্রাইজ একাই রাসিকের প্রায় ২৮০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ পেয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব কাজেই একচেটিয়া দাপটে কাজ পেয়েছেন রনি। বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান মিলে তার মোট কাজের পরিমাণ প্রায় ৪৮৪ কোটি টাকা। শুধু রাসিক নয়, প্রভাব খাটিয়ে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বড় বড় কাজ হাতিয়ে নিয়েছেন রনি। ভদ্রার শহীদ ক্যাপ্টেন মুনসুর রহমান পার্কের প্রায় ৫০ কোটি টাকার কাজ করছেন তিনি। বিশেষ করে রাসিকের সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের সময় জোর করেই তিনি সব কাজ নিয়েছেন। ২০১৮ সালে রাসিক মেয়র লিটন দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাসিকের বড় বড় সব কাজ একচেটিয়াভাবে পেয়েছেন রনি। বলা যায়, রাসিকের কাজের অন্তত ৭০ শতাংশ কাজ একা পেয়েছে রনি। কারণ রনি ছিল মেয়র লিটনের কাছের ও অস্থাভাজন। এছাড়াও রনি মহানগর আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে যুবলীগের সব প্রোগ্রামের খরচ বহন করতেন। যার কারণে আওয়ামী লীগ নেতারাও তার সব কাজেই সহযোগিতা করতেন।
জানা যায়, রনিকে এতো কাজ দেয়ার পেছনের কারণ হলো- তার ছিল সন্ত্রাসী বাহিনী। রাজশাহী নগরীর অস্ত্রধারী রুবেলের মত ক্যাডারকে তিনি পুষতেন। রাসিক মেয়র লিটন থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতারা এ বাহিনীর দাপটে চলতো। রাজশাহীতে রনি প্রথম হেলমেট বাহিনীর জন্ম দেন। রনির পৃষ্ঠপোষকতায় রাজশাহীতে গড়ে উঠেছিল হেলমেট বাহিনী। বিএনপি-জামায়াত কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করলে তাদের প্রতিহত করতে পুলিশের সাথে এই হেলমেট বাহিনী রাখা হতো মাঠে। রনির সহযোগি যুবলীগ নেতারা এক একটা অস্ত্রধারী ক্যাডার হিসাবে পরিচিত ছিল। এই ক্যাডার বাহিনী দিয়েই টেন্ডারবাজি, অন্যান্য ঠিকাদারকে হুমকি ধামকি দিয়ে কাজ বাগিয়ে নিয়ে তিনি গড়েছেন টাকার পাহাড়। এছাড়াও তিনি শুরু করেন ডেভেলপপারের ব্যবসা। জোর করে লোকজনের জমি নিয়ে তিনি এ ব্যবসায় পা রাখেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি নগরীতে কোনো বহুতল ভবন নির্মাণ করে যেতে পারেন নি।
জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিশেষ ভুমিকা রাখে রনি। তার রাজনৈতিক চেম্বার নগরীর দড়িখরবোনা এলাকায়। সেখান থেকে আন্দোলনকারীদের কিভাবে প্রতিহত করা হবে সেই প্লান পরিকল্পনা করা হতো। রাসিক মেয়রের নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের কিভাবে দমানো হবে তার সিদ্ধান্ত হতো দড়িখরবোনায়। শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ করে রনি। তার রাজনৈতিক কার্যালয়ের আশপাশের প্রায় রুমে ছিল অস্ত্রের মুজদ। এমন কোনো অস্ত্র ছিল না যে যুবলীগ নেতা রনির অধিনে ছিল না। ককটেল থেকে শুরু করে বোম, বিভিন্ন ধরনের দেশী বিদেশী পিস্তল, শাটারগান, দেশীয় বড় বড় হাসুয়াসহ দেশীয় অস্ত্রের মজুদ করে রেখেছিল রনি। যেগুলো বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের উপর ব্যবহার করতো যুবলীগের ক্যাডাররা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালীন সময়ে দিনভর যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতারা তান্ডব চালানোর পর রাতে রনির দড়িখরবোনা কার্যালয়ের সামনে চলতো ভুড়ি ভোজ। আর এর পুরো ব্যয় বহণ করতো যুবলীগ নেতা রনি। যদিও ৫ জানুয়ারী তিনি সহ তার ক্যাডার বাহিনী পালিয়ে যায়। ৫ আগস্টের পর আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা রনির রাজনৈতিক চেম্বারের বেশ কয়েকটি রুমে তল্লাশী চালিয়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধার করে।