ইসলাম ডেস্ক
আল্লাহ আপনার কথা উল্লেখ করবেন (যখন সবাই আপনাকে ভুলে যাবে)
আবির হোসেন রাজু
সূরাটির শুরুতে আল্লাহ প্রত্যেকটি মানুষকে একটি শক্তিশালী প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছেন। আল্লাহর বাণী থেকে সর্বোচ্চ উপকার পেতে হলে…বিশেষ করে যখন তিনি উল্লেখ করেছেন ‘আল-ইনসান’ শব্দটি। মানুষ। The human being.
এ শব্দটি শোনার পর মানব জাতি নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা করার পরিবর্তে, বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ যে এ দুনিয়ায় বাস করছে, অতীতে যারা গত হয়ে গেছেন তাদের নিয়ে চিন্তা করার পরিবর্তে আমাদের প্রত্যেকের উচিত আমার নিজের সম্পর্কে চিন্তা করা। আমার চিন্তা করা উচিত আমার নিজেকে নিয়ে, এমন আয়াত থেকে সর্বোচ্চ উপকার পেতে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আল-ইনসান’ শব্দটি।
তো, এটি খুবই ব্যক্তিগত একটি ম্যাসেজ; প্রত্যেকটি মানুষের চাহিদাকে সামনে রেখে ম্যাসেজটি পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের জন্য। কারণ সৌভাগ্যক্রমে আমরা সবাই বিশ্বাসী।
তো, আয়াতে ‘মানুষ’ শব্দটি শোনার সাথে সাথে, আমার উচিত আমার নিজের সম্পর্কে চিন্তা করা। আর আপনার উচিত আপনার নিজের সম্পর্কে চিন্তা করা। هَلۡ اَتٰی عَلَی الۡاِنۡسَانِ حِیۡنٌ مِّنَ الدَّهۡرِ لَمۡ یَکُنۡ شَیۡئًا مَّذۡکُوۡرًا – মানুষের উপর কি এমন একটা সময় অতিবাহিত হয়নি…সময়ের সীমাহীন সমুদ্র থেকে, ‘আদ্-দাহর’ সময়ের সীমাহীন সমুদ্র থেকে এমন একটা ছোট সময় কি অতিবাহিত হয়নি, যখন মানুষ এমন কিছু ছিল যা নিয়ে কথা বলার মত অবস্থা ছিল না? যার কথা উল্লেখ করার যোগ্য ছিল না। এবং এ অর্থটাও- সে স্মরণ যোগ্য কোনো বস্তু ছিল না।
আল্লাহ আমাকে আপনাকে খুবই সহজ একটি প্রশ্ন করছেন। এমন একটা সময় কি অতিবাহিত হয়নি যখন কেউ তোমার কথা মনে করতো না? এমন একটা সময় কি ছিল না যখন কেউ তোমার ব্যাপারে কিছু বলত না? যদিও তোমার অস্তিত্ব ছিল কিন্তু মানুষ তোমাকে নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পেতো।
তোমার ব্যাপারে কথা বলতে তাদের অস্বস্তি লাগত। তৎক্ষণাৎ পরবর্তী আয়াতেই তিনি বলেন- তিনি মানুষকে একটি তরল পদার্থ থেকে সৃষ্টি করেছেন। এক ফোঁটা পানি থেকে। নুতফা। যা মিশ্রিত। অর্থাৎ, মিশ্রিত নারী এবং পুরুষের মাঝে। আল্লাহ এখন এমন কিছু নিয়ে কথা বলছেন, বীর্য নিয়ে, ডিম্ব নিয়ে, যা পরস্পর মিলিত হয়, একজন নারীর গর্ভধারণ নিয়ে। যা নিয়ে কথা বলাটা অস্বস্তিকর এবং লজ্জাজনক। তাই, এটা এমন কিছু নয় যা নিয়ে আপনি হর হামেশাই কথা বলেন। এমন কিছু নয় যা নিয়ে নিঃসঙ্কোচে কথা বলেন। আগের আয়াতে আল্লাহ ইতোমধ্যে বলেছেন, তোমার অবস্থা একসময় এমন ছিল যা উল্লেখ করার যোগ্য ছিল না। যা স্মরণযোগ্য ছিল না।
এই আয়াতে কয়েক স্তরের অর্থ রয়েছে। আমি কয়েকটি স্তর আমার জন্য এবং আপনাদের সবার জন্য খোলাসা করে তুলে ধরতে চাই।
মহাবিশ্ব, বস্তুগত বিশ্বকে আমরা যেভাবে জানি, পদার্থবিজ্ঞানীরা আমাদের বলেছেন এটি ১৩.৯ বিলিয়ন বছর যাবত বর্তমান আছে। আর এই গ্রহটি সম্ভবত চার বা পাঁচ বিলিয়ন বছর যাবত টিকে আছে। অর্থাৎ, এই গ্রহের গঠনকাল। এই সমস্ত সময়ের সীমাহীন সমুদ্রগুলোতে আমাকে নিয়ে কোনো কথা হতো না। কোথাও আমার কোনো উল্লেখ ছিল না। আমার অস্তিত্ব ছিল না।
এমনকি যখন এ মহাবিশ্ব বাস্তবে এলো, সীমাহীন পরিমাণ সময় পার হওয়ার পর, এই গ্রহে যখন মানব জাতির বসবাস শুরু হলো। মানব ইতিহাসের বৃহত্তর অংশটি ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে, আর সেই ইতিহাসের কেউই জানতো না আমি কে। আমার কথা কেউ কখনো মনে করেনি, আমার নাম কখনো উল্লেখ করা হয়নি। আপনি ইতিহাস সম্পর্কে অধ্যয়ন করতে পারেন, আর ঐ মানুষগুলো প্রাসঙ্গিক, একমাত্র যার কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই সে হলো আপনি আমি। তাদের কাছে আমাদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। আমাদের কাছে তাদের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু তাদের কাছে আমাদের অস্তিত্ব ছিল না।
এ কথাগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ বলেছেন- অধিকাংশ সময় ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, যখন আপনি আর আমি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ছিলাম। আমরা গল্পের অংশ ছিলাম না।
আল্লাহ এ উপায়ে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সামান্য যে কিছু সময়কাল আমরা বর্তমান থাকি, আমাদের মায়ের গর্ভ থেকে দুনিয়াতে আসার পর… বস্তুত, আমার মা যখন আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন শুরুতে, তার কোনো ধারণাই ছিল না যে আমি তার পেটের ভেতর। “مَرَّتۡ بِهٖ” – “সে বাচ্চাকে নিয়ে চলাফেরা করতে থাকল।” (৭:১৮৯) সে জানেও না। এরপর সে যখন তার শরীরে পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করলো, তখন তারা উভয়ে আল্লাহর নিকট দোয়া করতে শুরু করে। لَئِنۡ اٰتَیۡتَنَا صَالِحًا – “যদি আপনি আমাদেরকে সুসন্তান দান করেন।” (৭:১৮৯)
তারা এমনকি জানেও না এ সন্তানটা কে? এমনকি যখন তারা স্মরণে আনত, আমার মা যখন আমার সম্পর্কে ভাবতেন, যখন আমি তার পেটে ছিলাম, উনি জানতেন না আমি কে। উনি আমাকে নিয়ে যথাযথভাবে ভাবতে পারতেন না। শুরুতে উনি জানতেন না আমি কি ছেলে নাকি মেয়ে। উনি জানতেন না আমি কোন ধরণের সন্তান হবো। কি কি গুণাবলী আমার থাকবে। উনি কিছুই জানতেন না।
কিন্তু এমনকি এ দুনিয়াতে আমার আগমনের পরে, এ ধরায় আমার পদার্পণের পরেও একটি জিনিস আপনারা লক্ষ্য করবেন। মানব জাতি তার গঠন প্রকৃতি অনুসারেই অন্যদের মনোযোগ আকাঙ্ক্ষা করে। মানুষের জন্য ব্যবহৃত একটি শব্দ হলো ইনসান। আর ইনসানের একটি উৎপত্তিগত শব্দ হলো উন্স। আর উন্স মানে ভালোবাসা এবং মায়া-মমতা। মানুষ শুধু ভালোবাসা প্রদান করে না, তারা ভালোবাসা গ্রহণও করতে চায়। তারা মায়া-মমতা পেতে চায়।
সেজন্য বাচ্চাকাল থেকেই, যে মুহূর্ত থেকে সে নিজের সম্পর্কে কিছুটা সচেতন হতে শুরু করে, সে মানুষের কাছ থেকে মনোযোগ পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। মা যদি বাচ্চার দিকে না তাকায়– আম্মু, আম্মু, আম্মু, আম্মু। আপনাদের যাদের ছোট বাচ্চা আছে ব্যাপারটা জানেন ইতোমধ্যে। বাচ্চাদের মনোযোগ প্রয়োজন। তারা সর্বদা এর খোঁজ করে। এরপর আরেকটু বড় হয়ে উঠলে তারা কিছু একটা এঁকে আপনাকে দেখাতে চায়। কারণ তারা আপনার মনোযোগ চায়। তারা স্বীকৃতি চায়। “দেখো, আমি কী জামা পরেছি! দেখো, আমি কী এঁকেছি! দেখো, আমি কী করতে পারি! “
বাচ্চাটা এখনো লাফ দিতে পারে না। উপরের দিকে একটু খানি লাফ দিয়ে বলে- আমাকে দেখো! দেখেছো? আবার দেখো। কারণ, তার নিজের জন্য ঐ মনোযোগটুকু দরকার। সে ‘মাজকুর’ হতে চায়। (সূরা ইনসানের প্রথম আয়াতে উল্লেখিত শেষ শব্দটি ‘মাজকুর’) মাজকুর মানে– যার কথা উল্লেখ করা হয়। যার নাম স্মরণে আনা হয়। এটি মানব প্রকৃতির ভেতরে স্থাপন করে দেওয়া হয়েছে।