মোস্তাফিজুর রহমান লিটন , রাজশাহী ব্যুরো:
শিক্ষা ও সংস্কৃতির শহর হিসেবে পরিচিত রাজশাহী এখন ধীরে ধীরে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি শহরজুড়ে বাড়ছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিভিন্ন বিশেষায়িত সেবার পরিধিও বাড়ছে। তবে চিকিৎসাসেবার অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধির সঙ্গে চিকিৎসার মান এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চিকিৎসা ব্যয় রাখা সম্ভব হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রাজশাহী বিভাগের আট জেলার পাশাপাশি বিভাগের বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চিকিৎসার জন্য রাজশাহী শহরে আসেন। উন্নত চিকিৎসার প্রত্যাশায় রোগীদের এই আগমন প্রমাণ করে, উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে রাজশাহীর চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর যথেষ্ট আস্থা রয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক পরিবারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র। ১ হাজার ২০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রায়ই ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ দেখা যায়। ফলে শয্যা সংকট, চিকিৎসক ও নার্সের স্বল্পতা এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালেও শয্যা ও জনবল সংকটের বিষয়টি দীর্ঘদিনের।
অন্যদিকে নগরীতে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রাজশাহী বিভাগে অনুমোদিত বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাজারেরও বেশি। ফলে চিকিৎসাসেবার সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে রোগীদের সামনে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়ার সুযোগও।
তবে শুধু হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়লেই চিকিৎসার মান নিশ্চিত হয় না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মানসম্মত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা, নির্ভুল রোগ নির্ণয় এবং রোগীর প্রতি মানবিক আচরণ। একটি আধুনিক ভবন কিংবা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেই একটি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিত হয় না।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উন্নত কিছু ডায়াগনস্টিক যন্ত্র যুক্ত হওয়ায় রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দ্রুত ও নির্ভুল পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বাড়লে রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায়।
তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, চিকিৎসা প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধা যত আধুনিক হচ্ছে, চিকিৎসা করানোর খরচও যেন তত বাড়ছে। একজন রোগীর চিকিৎসা ব্যয় শুধু চিকিৎসকের ফি কিংবা হাসপাতালের বিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ, ওষুধের মূল্য, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনের কর্মঘণ্টা হারানোর মতো নানা ব্যয়।
ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য হঠাৎ কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়া শুধু শারীরিক বা মানসিক সংকট নয়, অনেক সময় তা বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা কিংবা বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়।
অবশ্য চিকিৎসাখাত রাজশাহীর অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রোগীদের আগমনকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পাশাপাশি ওষুধের দোকান, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিকিৎসাখাতের এই বিস্তার নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
তবে চিকিৎসাব্যবস্থার সাফল্য শুধু হাসপাতালের সংখ্যা কিংবা রোগীর সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত রোগ প্রতিরোধ, সময়মতো রোগ নির্ণয়, সঠিক চিকিৎসা এবং মানুষের সুস্থতা নিশ্চিত করা
রাজশাহীর চিকিৎসাখাত আরও বিস্তৃত ও আধুনিক হোক—এটাই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে চিকিৎসা যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যয় কমে এবং সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই চিকিৎসাসেবার মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়, সেটিও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজশাহীকে সত্যিকার অর্থে একটি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ নয়, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি, সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, সেবার মান তদারকি এবং রোগীর অধিকার নিশ্চিত করার দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
মানুষের প্রত্যাশা একটাই—রাজশাহীর চিকিৎসাখাত বড় হোক, আধুনিক হোক; তবে সেই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকুক মানুষের সুস্থতা, সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও মানবিক সেবা।
প্রকাশক - শেখ রবিউল ইসলাম রবি, সম্পাদক - মোঃ আনিসুর রহমান, বার্তা সম্পাদক - শারীদ মোল্লা। অস্থায়ী প্রধান কার্যালয় - সোনারগাঁ,নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা -বাংলাদেশ। Reg : TL-1061, fb: daily nayakontho, e-mail :[email protected], [email protected],web:www.dailynayakontho.com,
কপিরাইট © প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | দৈনিক নয়া কন্ঠ | Developed by UNIKBD.COM