অভিযানে ভুবন মোহন পার্ক, বদলায় না চিত্র
মোস্তাফিজুর রহমান লিটন
রাজশাহী ব্যুরো
রাজশাহীর ঐতিহাসিক ভুবন মোহন পার্কে একের পর এক অভিযান হলেও বদলাচ্ছে না পার্কটির সামগ্রিক চিত্র। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, জুয়ার আসরে অভিযান কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতা—মাঝেমধ্যে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ দেখা গেলেও কিছুদিন পরই পুরোনো চেহারায় ফিরে আসে নগরীর এই ঐতিহাসিক স্থানটি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, অভিযানই কি শেষ কথা, নাকি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা?
গত ২৫ আগস্ট রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) ভ্রাম্যমাণ আদালত ভুবন মোহন পার্কের গণশৌচাগারের দ্বিতীয় তলায় থাকা একটি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সেটি সিলগালা করে। এর একদিন আগে, ২৪ আগস্ট রাতে পার্কের ভেতরের একটি কক্ষে জুয়ার আসরে অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে আটক করা হয়।
সাম্প্রতিক এই দুই অভিযানের পর আবারও আলোচনায় এসেছে ভুবন মোহন পার্কের নিরাপত্তা, পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টি। নগরবাসীর প্রশ্ন—অভিযান শেষে পার্কটি কি আবারও দখল, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের পুরোনো চক্রে ফিরে যাবে?
রাজশাহী নগরীর প্রাণকেন্দ্র সাহেব বাজারে অবস্থিত ভুবন মোহন পার্ক শুধু একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়; এটি রাজশাহীর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি স্থান। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই পার্ক। ভাষা আন্দোলনের সময় কলেজে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকায় এখান থেকেই বিভিন্ন বার্তা শহরবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।
১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভুবন মোহন পার্কে শহীদ মিনার নির্মাণ করে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করা হয়। এটি দেশের অন্যতম প্রাচীন শহীদ মিনার হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে শহীদ মিনারটি আধুনিকভাবে সংস্কার করা হয় এবং ২০০৫ সালে ৬৪ জন ভাষাসৈনিকের নামসংবলিত একটি স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করা হয়।
ইতিহাসের সাক্ষী এই পার্ককে ঘিরে একসময় সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও জমজমাট পরিবেশ ছিল। বর্তমানে সেই পরিবেশ অনেকটাই ম্লান। শহীদ মিনারকে ঘিরে থাকা ছোট্ট পার্কটিতে গাছপালা, বসার স্থান ও খোলামেলা পরিবেশ থাকলেও নানা অনিয়মে এর সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পার্কের চারপাশে গড়ে উঠেছে পুরি, সিঙ্গারা, বেগুনি, চপসহ বিভিন্ন খাবারের দোকান ও ফাস্টফুডের ভ্রাম্যমাণ গাড়ি। রয়েছে চায়ের আড্ডা, পান-সিগারেটের দোকান। এসবের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে সাইকেল-মোটরসাইকেলের গ্যারেজ, দোকানপাট ও বিভিন্ন ধরনের অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।
নগরবাসীর কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, সন্ধ্যার পর পার্কের পরিবেশ আরও নাজুক হয়ে পড়ে। সেখানে বখাটেদের আড্ডা, মাদকসেবীদের আনাগোনা ও নানা অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে। ফলে পরিবার নিয়ে সেখানে সময় কাটানোর পরিবেশ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও সচেতন মহলের মতে, শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে ভুবন মোহন পার্কের ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্থায়ী পরিকল্পনা। পার্কের ভেতর ও চারপাশের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির নান্দনিকতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের প্রস্তাব, পার্কের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এর প্রবেশপথ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। বিশেষ দিবস ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সময় উন্মুক্ত রাখার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হলে এটি আবারও নগরবাসীর বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, সাময়িক অভিযান নয়—ভুবন মোহন পার্কের ঐতিহ্য রক্ষায় এবার নেওয়া হবে স্থায়ী উদ্যোগ। রাজনৈতিক আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এই নীরব সাক্ষীকে দখল ও অব্যবস্থাপনার হাত থেকে রক্ষা করে নতুন প্রজন্মের কাছে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।
অভিযান হবে, অবৈধ স্থাপনা সরবে—কিন্তু এরপরও যদি একই চিত্র ফিরে আসে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়: ঐতিহাসিক ভুবন মোহন পার্কের কি সত্যিই স্থায়ীভাবে বদল হবে, নাকি অভিযান শেষে আবারও ‘যে লাউ সেই কদু’?
প্রকাশক - শেখ রবিউল ইসলাম রবি, সম্পাদক - মোঃ আনিসুর রহমান, বার্তা সম্পাদক - শারীদ মোল্লা। অস্থায়ী প্রধান কার্যালয় - সোনারগাঁ,নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা -বাংলাদেশ। Reg : TL-1061, fb: daily nayakontho, e-mail :[email protected], [email protected],web:www.dailynayakontho.com,
কপিরাইট © প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | দৈনিক নয়া কন্ঠ | Developed by UNIKBD.COM