প্রবাসীদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি
সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার, ,
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি আজ প্রবাসী বাংলাদেশিরা। সরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৭০টিরও বেশি দেশে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত বা বসবাস করছেন। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক কর্মসংস্থান রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, ওমান, কুয়েত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে। প্রতি বছর তাঁরা দেশের জন্য দশক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস এবং আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই বিশাল শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ এখনো স্বল্পদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যায়। ফলে তারা তুলনামূলক কম মজুরি পায় এবং উন্নত কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয়। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, বিদ্যুৎ, অটোমেশন, জাহাজ নির্মাণ, ওয়েল্ডিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি এবং আধুনিক কারিগরি দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই চাহিদার তুলনায় বাংলাদেশ এখনো পর্যাপ্ত দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারেনি।
বিদেশগামী কর্মীদের অন্যতম বড় সংকট হলো অভিবাসন ব্যয়ের অস্বাভাবিক উচ্চতা। অনেক ক্ষেত্রে একজন কর্মীকে বিদেশে যেতে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়, যার বড় অংশই দালাল ও সিন্ডিকেটনির্ভর প্রক্রিয়ায় অপচয় হয়। এর ফলে অনেক প্রবাসী ঋণের বোঝা নিয়ে বিদেশে যান এবং দীর্ঘ সময় শুধু ঋণ পরিশোধ করতেই ব্যয় করেন।
বিদেশে গিয়েও সমস্যার শেষ হয় না। অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক চুক্তি অনুযায়ী বেতন না পাওয়া, পাসপোর্ট জব্দ, অতিরিক্ত শ্রম, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, আইনি সহায়তার অভাব, শ্রম অধিকার লঙ্ঘন এবং মানবিক নির্যাতনের শিকার হন। প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরে আসে, কিন্তু অনেক পরিবার ক্ষতিপূরণ বা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে দীর্ঘ ভোগান্তির মুখোমুখি হয়। দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরেও অনেক প্রবাসী হয়রানির অভিযোগ তুলে থাকেন।
এই বাস্তবতায় প্রবাসীদের উত্থাপিত ছয় দফা দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। দাবিগুলো হলো—প্রবাসীদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু করা; বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যয় কমিয়ে দালাল ও সিন্ডিকেটনির্ভর ব্যবস্থা বন্ধ করা; আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ; দেশে ও বিদেশে প্রবাসীদের জীবন, সম্পদ ও বিমানবন্দরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; দুর্ঘটনা, মৃত্যু ও মানবিক সংকটে শক্তিশালী প্রবাসী কল্যাণ ও জরুরি সহায়তা তহবিল গঠন; এবং প্রবাসীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন ও নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, নিরাপদ অভিবাসন এবং প্রবাসীবান্ধব রাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলার ওপর। প্রবাসীদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করার সময় এখনই। তাঁদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে এবং দেশের অর্থনীতিও হবে আরও টেকসই ও সমৃদ্ধ।
(লেখক: সাংবাদিক, শিক্ষক ও কলামিস্ট) সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার চট্টগ্রাম বাংলাদেশ
প্রকাশক - শেখ রবিউল ইসলাম রবি, সম্পাদক - মোঃ আনিসুর রহমান, বার্তা সম্পাদক - শারীদ মোল্লা। অস্থায়ী প্রধান কার্যালয় - সোনারগাঁ,নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা -বাংলাদেশ। Reg : TL-1061, fb: daily nayakontho, e-mail :[email protected], [email protected],web:www.dailynayakontho.com,
কপিরাইট © প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | দৈনিক নয়া কন্ঠ | Developed by UNIKBD.COM