চট্টগ্রাম অঞ্চলে দিশাহারা লাখ লাখ মানুষ
মোঃ সৈয়দ মিয়া : চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম অঞ্চলে টানা এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি বেশির ভাগ এলাকা থেকে নেমে গেছে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র। মাঠের ফসল হারিয়ে, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখেছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গত কয়েক লাখ মানুষ। যেন বন্যার পানি চলে গিয়ে রেখে গেছে তাদের চোখের পানি। ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫ হাজার ২২৩টি বসতঘর। ক্ষতির মুখে পড়েছে ৩৮২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভেঙে গেছে বা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৬০টি সেতু ও কালভার্ট। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায়। রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমির আউশ ধান, আমনের বীজতলা, আদা-হলুদসহ বিভিন্ন রকমের ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এ পার্বত্য জেলায় প্রায় ৫৩ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় শুধু কক্সবাজার জেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন।
চট্টগ্রাম জেলা
ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান বলেন, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম মহানগরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ জুলাই শুরু হওয়া টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। অনেক স্থানে কয়েক দিন ধরে পানি জমে থাকায় ঘরবাড়ি, সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যাসংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী উপজেলায়। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ৫১৯টি বসতঘর। নষ্ট হয়েছে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক। বন্যায় এ উপজেলায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
সাতকানিয়ার পরিস্থিতিও ছিল ভয়াবহ। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। সেখানে ২ হাজার ৪৮০টি বসতঘর, ৬৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১৮৭ কিলোমিটার সড়ক এবং ৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ উপজেলাতেও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
সন্দ্বীপ উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে ১ হাজার ৬৪০টি বসতঘর, তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৫০ কিলোমিটার সড়ক এবং চারটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আনোয়ারার ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে ১৪৫টি বসতঘর, ৬৫ কিলোমিটার সড়ক ও পাঁচটি কালভার্ট ক্ষতির মুখে পড়েছে। সীতাকুণ্ডের ৪০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে ১ হাজার ২৩০টি বসতঘর, সাতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৬০ কিলোমিটার সড়ক ও চারটি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফটিকছড়িতে ৩৭৮টি বসতঘর, ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৭৫ কিলোমিটার সড়ক এবং ২০টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাটহাজারীর ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে ৭২৩টি বসতঘর, ৮০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৩টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতির মুখে পড়ে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে এই উপজেলায়। সেখানে ১৮২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ৫১০টি বসতঘর, ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৬০ কিলোমিটার সড়ক ও ১৭টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্ণফুলীতে ৭৭টি বসতঘর ও ১৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাউজানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৪৫টি বসতঘর, দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৪৭ কিলোমিটার সড়ক ও ১০টি কালভার্ট। বোয়ালখালীতে ৩৮টি বসতঘর, ২৩ কিলোমিটার সড়ক ও ১৭টি কালভার্ট, পটিয়ায় ১২১টি বসতঘর, পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৪২ কিলোমিটার সড়ক ও ২৪টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চন্দনাইশে ২৩৫টি বসতঘর, ২৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৩৮ কিলোমিটার সড়ক ও ১৮টি কালভার্ট এবং লোহাগাড়ায় ৫৩৪টি বসতঘর ও ৬৭ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে। বন্যার প্রভাব পড়ে চট্টগ্রাম মহানগরেও। টানা বৃষ্টিতে নগরের ২৪টি ওয়ার্ডের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়। এতে ২ হাজার ২৪৬টি বসতঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়েছে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। পাশাপাশি প্রায় ১২৪ কিলোমিটার সড়ক বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার ভাষ্য, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা হচ্ছে। যেসব এলাকায় পানি নেমে গেছে, সেখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুর্গত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজও চলছে
প্রকাশক - শেখ রবিউল ইসলাম রবি, সম্পাদক - মোঃ আনিসুর রহমান, বার্তা সম্পাদক - শারীদ মোল্লা। অস্থায়ী প্রধান কার্যালয় - সোনারগাঁ,নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা -বাংলাদেশ। Reg : TL-1061, fb: daily nayakontho, e-mail :[email protected], [email protected],web:www.dailynayakontho.com,
কপিরাইট © প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | দৈনিক নয়া কন্ঠ | Developed by UNIKBD.COM