মোঃ আব্দুল আলীম, বগুড়াঃ
বগুড়া নগরের কাঁঠালতলা তিন নম্বর রেলগেট এলাকায় রোববার সকালে আম কিনতে এসেছিলেন গাবতলী উপজেলার নেপালতলীর কৃষক এস এম সেকেন্দার আলী। কয়েকজন ফল বিক্রেতা দোকানে ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, ক্ষীরশাপাতি, হাঁড়িভাঙাসহ হরেক জাতের আমের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। দোকানিদের সঙ্গে দরদাম করেও আম না কিনে ফিরে যাচ্ছিলেন অনেকেই। কৃষক সেকেন্দার আলী তাঁদের একজন।
কথা বলতে চাইলে সেকেন্দার আলী বলেন, রাজশাহী, নওগাঁ, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগান থেকে প্রচুর আম এসেছে বগুড়ার বাজারে। কিন্তু দাম আকাশছোঁয়া। ল্যাংড়া আম বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি। ক্ষীরশাপাতির দাম আরও বেশি। হাঁড়িভাঙা ও আম্রপালির কেজি ১০০ টাকা। অথচ প্রতিবছর এ সময় ভালো মানের আম কেনা যেত প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৬০ টাকায়।
বগুড়া মহানগরের কাটনারপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী ফরহাদ হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগেও পাঁচ কেজি ক্ষীরশাপাতি আম কিনেছিলাম ৩০০ টাকায়। এখন একই মানের আম কিনতে ৮০০ টাকা লাগছে। ১৫ দিন আগে যে আম ছিল গরিবের ফল, ১৫ দিনের ব্যবধানে দাম বেড়ে সেই আম কি ধনীদের ফল হয়ে গেল?’
ফরহাদ হোসেনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সত্যতা পাওয়া গেল অনেকাংশে। বগুড়ার স্টেশন সড়কের পাইকারি আড়ত থেকে শুরু করে সাতমাথার ফল মার্কেট, শহরের স্টেশন সড়ক, কবি নজরুল ইসলাম সড়ক, ফতেহ আলী সেতু সড়ক ও কাঁঠালতলা এলাকার ফুটপাত—সবখানেই অন্যান্য মৌসুমি ফলের পাশাপাশি আম সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও রংপুর থেকে ট্রাকে ট্রাকে আম আসছে। সকালে স্টেশন সড়কের আড়তের সামনে শত শত ক্রেটভর্তি আমের জমজমাট বেচাবিক্রি চলছে। কিন্তু সরবরাহ বাড়লেও খুচরা বাজারে আমের দাম বেশি বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতারা।
রোববার সকালে নগরের স্টেশন সড়কের ফলের আড়তে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতা–বিক্রেতাদের হাঁকডাকে বাজার জমজমাট। একের পর এক ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছে আমভর্তি ক্রেট। শ্রমিকেরা সেগুলো মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছেন আড়তে। আড়তের সামনে বসেছে আমের বাজার। খুচরা বিক্রেতারা সেখানে দরদাম করে আম কিনছেন। কোনো কোনো আড়তে আবার চলছে নিলাম।
ফল ব্যবসায়ীরা জানান, মে মাসের শেষ থেকে আমের মৌসুম শুরু হয়। জুনের প্রথম সপ্তাহে বাজারে অনেক আম উঠতে শুরু করে। প্রধান মৌসুম থাকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। শুরুর দিকে বাজারে আসে সাতক্ষীরার আম। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর ও নওগাঁ দেশের প্রধান আম উৎপাদনের এলাকা। বর্তমানে বগুড়ার বাজারে বেশির ভাগ আম রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও রংপুর অঞ্চল থেকে আসছে।
পাইকারি বাজারে আমের দাম বেশি
স্টেশন সড়কের একাধিক আড়ত ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে ক্ষীরশাপাতি আম বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা মণ দরে। অর্থাৎ প্রতি কেজি ক্ষীরশাপাতি আমের পাইকারি দাম পড়ছে গড়ে ১৫০ টাকা। একইভাবে ল্যাংড়া ও ফজলি আম পাইকারি পর্যায়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। ল্যাংড়া আম মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা মণ দরে। আম্রপালি আম মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা মণ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বেশি হওয়ায় খুচরা ব্যবসায়ীরা আম্রপালি ও হাঁড়িভাঙা আম বেশি কিনছেন। আম্রপালি আম সাধারণত আসে নওগাঁ থেকে। হাঁড়িভাঙা আসে রংপুর থেকে। অন্যবার ভালো মানের হাঁড়িভাঙা সর্বোচ্চ ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এবার সেই আম পাইকারি পর্যায়ে ৬০ থেকে ৭০ টাকার কমে মিলছে না। ভালো মানের আম্রপালি আম পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে। হাতবদলের পর খুচরা পর্যায়ে ভালো মানের আম্রপালি ১২০ ও হাঁড়িভাঙা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ল্যাংড়া বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা কেজি দরে। আর ক্ষীরশাপাতি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে।
পাইকারি ফলের আড়ত তুষার ফল ভান্ডারের তুষার হোসেন বলেন, এবার ক্ষীরশাপাতি ও ল্যাংড়া আমের সরবরাহ কম। এখন এই দুই জাতের আমের উৎপাদন এলাকা রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগানেই দাম আকাশছোঁয়া। বাগান থেকে আম কিনতে বেশি টাকা লাগছে। বাজারে হাঁড়িভাঙা ও আম্রপালির সরবরাহ এখন বেশি।
বগুড়া ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সেকেন্দার আলী বলেন, মৌসুমের শুরুতে ক্ষীরশাপাতি আম প্রতি মণ ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এখন সেই আম এক লাফে ৬ হাজার টাকায় উঠেছে। ১ হাজার ৪০০ টাকার ল্যাংড়া আমের দাম উঠেছে ৪ হাজার টাকায়। হাঁড়িভাঙা ও আম্রপালি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে। গত বছর ভরা মৌসুমে ক্ষীরশাপাতি গড়ে ১ হাজার ৬০০ টাকা, ল্যাংড়া ১ হাজার ৪০০ টাকা, আম্রপালি ১ হাজার ২০০ টাকা ও হাঁড়িভাঙা গড়ে ১ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে। এবার পাইকারি বাজারেই দাম অস্বাভাবিক।
খুচরা বাজারেও দাম বেশি
পাইকারি বাজারে আমের দাম বেশি হওয়ায় খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। স্টেশন সড়ক থেকে আম কিনে নগরের কাঁঠালতলা এলাকায় বিক্রি করেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। কাঁঠালতলা বাজারের ফল বিক্রেতা আফসার উদ্দিন ১০ ক্রেট আম কিনেছেন। তিনি বলেন, ‘আড়ত থেকে হাঁড়িভাঙা আম কিনেছি ৫৫ টাকা কেজি দরে। বিক্রি করছি ৮০ টাকা দরে। আম্রপালি কিনেছি ৭০ টাকা কেজি। বিক্রি করছি ১০০ টাকা কেজিতে। গত বছর পাইকারি দাম কম ছিল। খুচরা এ দুই জাতের আম গড়ে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি। এবার দাম দ্বিগুণ।’
নগরের সাতমাথা, তিন নম্বর রেলগেট, স্টেশন রোড ও ফতেহ আলী সড়ক এলাকার ফলের দোকান ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে প্রতি কেজি আম জাতভেদে ৮০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ফল ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমের মৌসুম খুব বেশি দিনের নয়। এ কারণে মৌসুমের শুরু ও মাঝামাঝি সময়ে চাহিদা বেশি থাকে। এবার চাহিদার সঙ্গে দামও বেশি।
প্রকাশক - শেখ রবিউল ইসলাম রবি, সম্পাদক - মোঃ আনিসুর রহমান, বার্তা সম্পাদক - শারীদ মোল্লা। অস্থায়ী প্রধান কার্যালয় - সোনারগাঁ,নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা -বাংলাদেশ। Reg : TL-1061, fb: daily nayakontho, e-mail :[email protected], [email protected],web:www.dailynayakontho.com,
কপিরাইট © প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | দৈনিক নয়া কন্ঠ | Developed by UNIKBD.COM