কলমে: হাবিবুর রহমানঃ
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় কর্তৃপক্ষের গাফিলতি প্রমাণিত হওয়া এবং কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিসের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকার মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নবজাতকদের মৃত্যুর পেছনে মূলত দুটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে—
১. বাতাস চলাচলের ব্যর্থতা— অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা না থাকা।
২. কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি— ওয়ার্ডের ভেতরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকায় কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে ক্ষতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকার ফলে ওয়ার্ডে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। যদি এ তথ্য সঠিক হয়ে থাকে, তবে এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; বরং দায়িত্বহীনতা ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার একটি গুরুতর উদাহরণ।
কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে বড় প্রশ্ন।
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও নিজস্ব একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। অধ্যাপক আতিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের সেই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে হাসপাতালের শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে দায়ী না করে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে দায়িত্বে থাকা এক নার্স এবং এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দায়ী করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অন্যদিকে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে দায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত ব্যর্থতা এবং পরিবেশগত নিরাপত্তাহীনতা।
অর্থাৎ একই ঘটনার দুটি তদন্ত প্রতিবেদনে দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে মৌলিক পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। একটি প্রতিবেদনে দায়ী দুইজন নিম্নপদস্থ কর্মী, অন্য প্রতিবেদনে দায়ী পুরো প্রতিষ্ঠান।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে— প্রকৃত দায়ী ব্যক্তি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা কি দুই পক্ষের তদন্তেই আড়ালে থেকে গেলেন?
একটি হাসপাতাল কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মানুষের জীবন ও আস্থার সঙ্গে জড়িত একটি সামাজিক অবকাঠামো। বছরের পর বছর অসংখ্য রোগী এখানে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন, জীবন ফিরে পেয়েছেন। ফলে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
তবে এটাও সত্য, যদি তদন্তে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা ও নিরাপত্তা ব্যর্থতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে থাকে, তাহলে জবাবদিহিতার প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগও নেই।
বর্তমানে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের সামনে আইনি পথ খোলা রয়েছে। তারা রিভিউ ও আপিলের সুযোগ পাবে। ফলে ভবিষ্যতে লাইসেন্স পুনর্বহালের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে সেটি নির্ভর করবে আইনি প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থানের ওপর।
ছয় নবজাতকের মৃত্যু কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি একটি গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমন মর্মান্তিক ঘটনাকেও রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে প্রকৃত বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্ন কখনও কখনও রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
পরিশেষে, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত দায়ীদের বিচার হোক। নিহত শিশুদের পরিবার ন্যায়বিচার পাক। আর প্রতিষ্ঠানটি যদি আইনি প্রক্রিয়ায় নিজেকে নির্দোষ বা সংশোধিত প্রমাণ করতে পারে, তবে ফিরে পাক তার লাইসেন্স, ফিরে পাক মানুষের আস্থা।
বিচার হোক সত্যের ভিত্তিতে, সিদ্ধান্ত হোক ন্যায়ের আলোকে।
প্রকাশক - শেখ রবিউল ইসলাম রবি, সম্পাদক - মোঃ আনিসুর রহমান, বার্তা সম্পাদক - শারীদ মোল্লা। অস্থায়ী প্রধান কার্যালয় - সোনারগাঁ,নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা -বাংলাদেশ। Reg : TL-1061, fb: daily nayakontho, e-mail :[email protected], [email protected],web:www.dailynayakontho.com,
কপিরাইট © প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | দৈনিক নয়া কন্ঠ | Developed by UNIKBD.COM