কক্সবাজার প্রতিনিধি:
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন অন্তত ৭০টি পরিবহন কোম্পানির বাস প্রবেশ করে। এসব বাস কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে ‘চা খরচ’, ‘পার্কিং ফি’ কিংবা ‘ম্যানেজমেন্ট খরচ’-এর নামে প্রতি মাসে প্রায় ৬ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে।
একাধিক বাস কোম্পানির প্রতিনিধি, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং পুলিশ সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসের সংখ্যা ও কোম্পানির আকারভেদে মাসিক ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের ফোন করে তাগাদা দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির প্রতিনিধি জানান, প্রতি মাসের ১ থেকে ৫ তারিখের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে হয়। সময়মতো টাকা না দিলে রেকার চালক ও অনলাইন বাস টার্মিনালের (ওটিবি) সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যোগাযোগ করেন। পরে কলাতলী মোড়ে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক সদস্যদের কাছে টাকা পৌঁছে দিতে হয়।
একজন পরিবহন প্রতিনিধি বলেন, “প্রতি মাসেই নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়।” আরেকজন প্রতিনিধি বলেন, “এটাকে অনেকেই অলিখিত নিয়ম হিসেবে ধরে নিয়েছে। নতুন কোনো কোম্পানি এলেও কিছুদিন পর তাদের কাছেও টাকা দাবি করা হয়।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং জেলা পুলিশ সুপার উভয়েই বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অভিযোগ যখন জেলা পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিকে নির্দেশ করছে, তখন একই প্রশাসনের মাধ্যমে তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাদের মতে, বিষয়টি স্বচ্ছভাবে তদন্ত করতে হলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থার সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, আদায়কৃত অর্থের কোনো সরকারি রসিদ বা লিখিত হিসাব দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ‘পার্কিং ব্যবস্থাপনা’ বা ‘ট্রাফিক সমন্বয়’-এর কথা বলা হলেও অর্থ গ্রহণের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নেই।
একজন পরিবহন ব্যবসায়ী বলেন, “যদি এটি বৈধ পার্কিং ফি হয়, তাহলে রসিদ কোথায়? সরকারি কোষাগারে টাকা জমার প্রমাণ কোথায়?” তার মতে, দীর্ঘদিনের এ ব্যবস্থার কারণে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপরও পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, বাস মালিকদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আদায়ের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ টাকার মতো। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এটিকে ‘এসপি অফিসের চা-নাস্তার খরচ’ বলেও উল্লেখ করেন।
স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিষয়টি তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশ সদর দপ্তর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর উদাহরণ; আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, “ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কক্সবাজার পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, কক্সবাজারে পরিবহন খাতকে কেন্দ্র করে কথিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার পরিবহন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বক্তব্যে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রকাশক - শেখ রবিউল ইসলাম রবি, সম্পাদক - মোঃ আনিসুর রহমান,
বার্তা সম্পাদক - শারীদ মোল্লা
কপিরাইট © প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | দৈনিক নয়া কন্ঠ | Developed by UNIKBD.COM