নয়া কণ্ঠ ডেস্ক:
ইরান-এ যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—পারমাণবিক অস্ত্রই কি এখন রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তার একমাত্র ভরসা হয়ে উঠছে? বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। তাঁর ভাষায়, “ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে কখনো শান্তি আসবে না।” এই অবস্থান থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামাতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে ইতোমধ্যে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে, যা আরও সমৃদ্ধ করা হলে একাধিক পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির হাতে রয়েছে বিপুল সংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর হামলা ইরানের পারমাণবিক অগ্রযাত্রা সাময়িকভাবে ধীর করতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ থামাতে পারবে না। বরং এই হামলার ফলে ইরান আরও বেশি করে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার বিশিষ্ট গবেষক রমেশ ঠাকুর মনে করেন, “ইরানের জন্য এখন পারমাণবিক অস্ত্রই টিকে থাকার একমাত্র গ্যারান্টি।” একই মত দিয়েছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্কের বিশ্লেষক জেনিফার কাভানাঘ। তাঁর মতে, বারবার হামলার মুখে পড়া একটি রাষ্ট্রের জন্য পারমাণবিক বোমা দ্রুততম নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতি শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁর দেশের পারমাণবিক অস্ত্র ধরে রাখার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি স্পষ্ট বার্তা যাচ্ছে—পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে বাইরের হস্তক্ষেপ ঠেকানো সহজ।
ইতিহাসও এই ধারণাকে আংশিকভাবে সমর্থন করে। মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও সাদ্দাম হোসেন পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগের পর ক্ষমতাচ্যুত হন। অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ায় আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও টিকে আছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব ইউরোপ ও এশিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতোমধ্যে পারমাণবিক সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের কথা জানিয়েছেন। এতে ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। একইভাবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ান-এও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে জনমত ও নীতিগত আলোচনা বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে, তবে সৌদি আরব, তুরস্ক এবং মিসর-এর মতো দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য একই পথে হাঁটতে পারে।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, বেশি সংখ্যক পারমাণবিক অস্ত্র মানেই নিরাপত্তা নয়; বরং ভুল বোঝাবুঝি বা দুর্ঘটনাজনিত যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ে। ফলে একটি নতুন আন্তর্জাতিক কাঠামো বা শক্তিশালী চুক্তির প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA) চুক্তির মাধ্যমে ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে সরে গেলে পরিস্থিতি আবার জটিল হয়ে ওঠে।
সবশেষে বিশ্লেষকদের অভিমত—যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখা। কিন্তু বাস্তবে এই পদক্ষেপ বিশ্বকে আরও একটি “পারমাণবিক যুগে” ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে প্রতিটি দেশ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য একই পথে হাঁটতে বাধ্য হতে পারে।
প্রকাশক - শেখ রবিউল ইসলাম রবি, সম্পাদক - মোঃ আনিসুর রহমান,
বার্তা সম্পাদক - শারীদ মোল্লা
কপিরাইট © প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | দৈনিক নয়া কন্ঠ | Developed by UNIKBD.COM