সুলতানা আক্তার, তেঁতুলিয়া (পঞ্চগড়) থেকে:
দেশের শিক্ষাঙ্গনে আজ নৈতিকতার চরম অবক্ষয়। ২০১৯ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় “কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা” জারি করলেও, তার বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে। ফলে শহর থেকে গ্রাম— সর্বত্র শিক্ষকরা কোচিং ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। শ্রেণিকক্ষের পাঠ হচ্ছে আনুষ্ঠানিকতা, আসল শিক্ষা এখন ‘কোচিং সেন্টারে’।
২০১২ সালের হাইকোর্ট নির্দেশনার পর সরকার ২০১৯ সালে নীতিমালা প্রণয়ন করে, যেখানে স্পষ্ট বলা আছে কোনো শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে পড়ানো যাবে, সেটিও প্রতিষ্ঠানপ্রধানের লিখিত অনুমতিতে।
কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই। অনেক বিদ্যালয়ে দেখা যায়, স্কুল শুরুর আগে কিংবা ছুটির পর একই শ্রেণিকক্ষেই চলছে কোচিং ক্লাস। অভিযোগ রয়েছে— শিক্ষকরা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্লাসে পাঠ অসম্পূর্ণ রাখেন, যাতে শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে যেতে বাধ্য হয়।
এক শিক্ষার্থী জানায়,“স্যার বলেন, ক্লাসে সব শেখা সম্ভব না— কোচিংয়ে গেলে বুঝবে। যারা যায়, তারাই ভালো নম্বর পায়।”যারা জায় না তাদের নাম্বার কমিয়ে দেওয়া হয়।
পঞ্চগড় সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিটি শিক্ষার্থীকে মাসে ১ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। একক প্রাইভেটে এই খরচ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার পড়ছে অর্থনৈতিক চাপে।
এক অভিভাবক সাগর আহমেদ বলেন, “দুই ছেলের প্রাইভেটের পেছনে মাসে ৬ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সংসারে টান পড়ে গেছে।”
অন্যজন অভিযোগ করেন,
“মেয়ে কোচিংয়ে না যাওয়ায় স্যার হুমকি দিয়েছেন— পরীক্ষায় বুঝে নেবেন!”
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ের ৭২% শিক্ষক কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনে যুক্ত। এর মধ্যে ৫৩% শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরই পড়ান, আর ৪৭% বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই ছুটির পর কোচিং চালান।
নীতিমালায় নির্ধারিত ফি (উপজেলায় ১৫০ টাকা, জেলায় ২০০, মহানগরে ৩০০ টাকা) ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ছাড়ের বিধান— প্রায় কেউই মানছেন না।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই,শিক্ষকতার নৈতিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো— শিক্ষার্থীদের প্রতি মানসিক চাপ ও ভয়ভীতি।
অভিযোগ আছে, প্রাইভেট না পড়ায় অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নম্বর কম দেন, এমনকি কখনও শারীরিকভাবে শাস্তি দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন “শ্রেণিকক্ষ এখন সময় পার করার জায়গা। কোচিংই তাদের আসল আয়ের উৎস।”স্কুল কলেজের কি দরকার, স্কুল কলের বন্ধ করে কোচিং গুলোর বৈধতা দিলেই হয়।
এডভোকেট আশিকুর রহমান বলেন,
“যেসব শিক্ষক ক্লাসে পাঠদান বাদ দিয়ে কোচিং চালান, তারা শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের সবচেয়ে বড় বাধা।”
একজন শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন,
“একজন মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অধীনে ৩০ থেকে ৫০টি স্কুল। নিয়মিত তদারকি করা কার্যত অসম্ভব।”
ব্যানবেইস জরিপে দেখা গেছে—
৬১% শিক্ষার্থী মনে করে কোচিং ছাড়া ভালো ফল সম্ভব নয়, আর ৪৩% শিক্ষার্থী ভয় পায় শিক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের কম নম্বর দিতে পারেন। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসহীনতা, হতাশা ও মানসিক ক্লান্তি বাড়ছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন নীতিমালা ও আইন থাকলেও তার বাস্তবায়নের অভাবে কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কার্যকর নজরদারি, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরবে না।
তাদের মতে, “এখনই যদি কোচিং বাণিজ্য রোধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবন ধ্বংসের মুখে পড়বে।”
নীতিমালা আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই—
ফলে শিক্ষকতার মহৎ পেশা আজ অর্থের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবক পড়ছেন মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপে।
প্রকাশক - শেখ রবিউল ইসলাম রবি, সম্পাদক - মোঃ আনিসুর রহমান,
বার্তা সম্পাদক - শারীদ মোল্লা
কপিরাইট © প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | দৈনিক নয়া কন্ঠ | Developed by UNIKBD.COM